Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 10:43 am

ঠাকুরগাঁওয়ে উন্নয়নবঞ্চিত বিশ্বাসপুর গ্রাম

image

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি: তিন দিকে বিল, একদিকে খাল। মাঝখানে বিশ্বাসপুর পশ্চিমপাড়া। বর্ষায় কাদাপানি আর শুকনো মৌসুমে ধুলোমাখা মেঠোপথই গ্রামের মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা। পাকা রাস্তা না থাকায় শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগসহ নানা নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের এ গ্রামের বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকা গ্রামটির মানুষের কাছে ভালো যোগাযোগব্যবস্থা এখনো স্বপ্ন।

বিশ্বাসপুর পশ্চিমপাড়ায় শতাধিক পরিবারের বসবাস। কৃষক, শিক্ষক, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ী থাকলেও অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। গ্রামের রাস্তা বর্ষায় পিচ্ছিল ও কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে, আর শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে চলাচল কঠিন হয়ে ওঠে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থী, রোগী ও বয়স্করা।

গ্রামের শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাকুন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এস কে মানিক শাহীন বলেন, বিশ্বাসপুর তার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষার্থী এলাকার একটি। সেখানকার শিক্ষার্থীরা ফসলি জমির আইল দিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। বর্ষাকালে হাঁটুপানি পেরিয়ে স্কুলে আসতে তাদের অনেক কষ্ট হয়।

তিনি বলেন, ‘আমি এই এলাকায় ১৪ বছর ধরে চাকরি করছি। এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা, বিশেষ করে রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। এ কারণে বিশ্বাসপুর ও বাকুন্দা গ্রামের শত শত পরিবার শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছে।’ তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

বিশ্বাসপুরের বাসিন্দা আবু হেলাল বলেন, ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছেন, গ্রামের রাস্তাটি পাকা করা হবে। কিন্তু আজও তা হয়নি। বর্ষায় রাস্তা ভেঙে গেলেও সরকারি উদ্যোগে মাটি ফেলে সংস্কার করা হয় না। একসময় স্কুলে যাওয়ারও নির্দিষ্ট রাস্তা ছিল না। তার বাবা প্রয়াত আব্দুল কুদ্দুস ও চাচারা স্বেচ্ছাশ্রমে একটি রাস্তা তৈরি করেন। পরে সেই পথ দিয়েই গ্রামের শিশুরা বিদ্যালয়ে যাতায়াত শুরু করে।

গ্রামের শিক্ষক সীমা আক্তার বলেন, একটি এলাকার উন্নয়নের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন ভালো যোগাযোগব্যবস্থা। বিশ্বাসপুরের মানুষ সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা পেতেও সমস্যায় পড়ছেন। তিনি দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

বিশ্বাসপুর পশ্চিমপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ধন মোহাম্মদ বলেন, গ্রামে প্রবেশের কোনো পাকা রাস্তা নেই। বিভিন্ন এলাকায় রাস্তা সংস্কারে সরকারি বরাদ্দ এলেও বিশ্বাসপুরের একমাত্র চলাচলের পথটি অবহেলিত রয়ে গেছে। দ্রুত রাস্তাটি পাকা করার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী হাসান আলী জানান, ফুটকিবাড়ি মাদ্রাসা মোড় থেকে ভকদগাজি বাজার পর্যন্ত সেটেলমেন্ট রেকর্ডে ২০ ফুট প্রশস্ত একটি খাস হালট রয়েছে। সেখানে মাটি ফেলে রাস্তা নির্মাণ করা হলে পটুয়া, ফুটকিবাড়ি, বাকুন্দা ও বিশ্বাসপুরসহ আশপাশের ২০ থেকে ২৫টি গ্রামের মানুষের যাতায়াত সহজ হবে। এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র; শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসচেতনতার দিক থেকেও পিছিয়ে রয়েছেন।

স্থানীয়দের উদ্যোগে ২০২৩ সালে স্বেচ্ছাশ্রমে একটি রাস্তা নির্মাণ করা হয়। প্রয়াত কৃষক আব্দুল কুদ্দুস, পাঞ্জাব আলী মাস্টার, মোস্তফাসহ স্থানীয় কয়েকজন নিজেদের ফসলি জমি ছেড়ে দিয়ে রাস্তাটি তৈরিতে সহযোগিতা করেন। উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য আনা-নেওয়া সহজ করা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণের পর থেকে রাস্তাটির উন্নয়ন বা রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রকৌশলী মো. মাবুদ হোসেন বলেন, রাস্তাটির দুরবস্থার বিষয়ে তিনি অবগত আছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে কীভাবে দ্রুত কাঁচা রাস্তাটি পাকা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করবেন।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি