সৈয়দ ইকবাল, ঢাকা: রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন, জোনভিত্তিক চলাচল ও রঙের মাধ্যমে পৃথক পরিচিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এজন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবায়নের শুরুতেই এ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক এনআইডির বিপরীতে পাঁচটি রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখায় শহরে রিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে একেকজন মালিকের ২০ থেকে ৩০টি ব্যাটারিচালিত রিকশা রাস্তায় চলাচল করছে। তাই মালিকরা কোনোভাবেই সেটি বন্ধ হোক চাইবে না। ফলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মাধ্যমে রিকশাগুলোর নিবন্ধন নিয়ে তা ঠিকই রাস্তায় অব্যাহত থাকবে। আবার জোনভিত্তিক কত রিকশা চলবে তার সংখ্যা নির্ধারণ করা না গেলে লাখ লাখ রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
অন্যদিকে ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে আটটি রঙে বিভিন্ন জোনে রিকশা চলাচলের পরিকল্পনা থাকলেও এসব রিকশার জন্য নির্দিষ্ট পার্কিংয়ের জায়গা নিশ্চিত করাও চ্যালেঞ্জ। এছাড়া চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের আওতায় না আনায় দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকাসহ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সহজ হবে না বলে পরিবহন বিশেষজ্ঞরা জানান। সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে পুরোনো রিকশা নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে অবৈজ্ঞানিকভাবে তৈরি এসব রিকশা বুয়েটের সনদ নিয়ে সড়কে চলাচলের সুযোগ পেলে যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও পুরোনো ই-রিকশায় উপযুক্ত যন্ত্রাংশ সংযোজন ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে মানসম্মত করার বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা জানান।
যদিও বাস্তবে তা করতে গেলে পুরোনো রিকশা সড়ক থেকে তুলে দেওয়ার বিষয়টিই ঘুরেফিরে আসছে, যা রাজনৈতিক বাস্তবতায় কঠিন। এছাড়া জোনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করলে যাত্রীদের বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে বারবার রিকশা পরিবর্তন করতে হবে, এটিও বড় চ্যালেঞ্জ। ফলে বিধিমালার মাধ্যমে অটোরিকশা কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়ম ঘোষণার সঙ্গে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় বিধিমালাটি শেষ পর্যন্ত নিবন্ধন ফি আদায়ের কাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকিতে পড়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ জারি করে। যেখানে দেশের ১৩টি সিটি করপোরেশন নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করাসহ নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, ফি জমার রশিদ ও ফিটনেস সনদ লাগবে, আর কর্তৃপক্ষকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়ার কথা বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীতিমালা বাস্তবায়নে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে— ঢাকার আট জোনে রিকশা আটকে রাখলে মানে যাত্রী ট্রান্সফার জোন বানালে সেখানে যাত্রী উঠানামায় জটলা বাড়বে। কেননা ঢাকার সড়কে এমনিতেই জায়গায় কম। এর পাশাপাশি অন্যান্য যানবাহনের যাত্রী-উঠানামার বিষয়টিও রয়েছে। ফলে এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হলে জোনভিত্তিক অনেক কম সংখ্যক রিকশা রাস্তায় নামাতে হবে, কিন্তু বাস্তবতায় সেটা প্রায় অসম্ভব বলে তারা অভিমত দেন। কেননা লাখ লাখ রিকশা অলরেডি রাস্তায় চলাচল করছে। সেগুলো সরানো অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। অন্যদিকে দীর্ঘ পথে যাত্রীকে বারবার রিকশা বদলাতে হলে সময় ও ভাড়া দুটোই বাড়বে। জোনের সীমানা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং সীমানা পেরোলে কী শাস্তি, তার কোনো ব্যাখ্যা না থাকায় নীতিমালাটি নিয়ে অনেক সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
অন্যদিকে এক এনআইডিতে পাঁচ রিকশা মানে শহরে আগের মতোই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার দাপট থাকছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন। ফলে নিবন্ধন হয়ে গেলে প্রশাসনের পক্ষে সেই রিকশা আটকানোর সুযোগও কমবে। এতে সড়কে রিকশার সংখ্যা কমার সম্ভাবনা ক্ষীণ, বরং বৈধতার ছাপ পেয়ে এদের উপস্থিতি আরও পোক্ত হবে। এছাড়া ট্রাফিক পুলিশের স্বল্পতায় অবৈধ অটোরিকশার অভিযানে বাধা থেকে যাওয়ার বিষয়টিও বিশেষজ্ঞরা অভিমত দেন।
তাদের মতে, রিকশার গতি, যাত্রীসংখ্যা, অনুমোদনহীন ব্যাটারি ও নিষিদ্ধ সড়কে চলাচল তদারকির দায়িত্ব পড়বে ট্রাফিক বিভাগের ওপর। কিন্তু নিয়মিত দায়িত্বের পাশাপাশি লাখ লাখ রিকশা থামিয়ে যাচাই করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব। কিউআর কোড যাচাইয়ের যন্ত্র, অ্যাপ বা তথ্যভান্ডার কে পরিচালনা করবে, সে বিষয়েও নীতিমালায় উল্লেখ না থাকায় এটি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিধিমালায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে বিশেষজ্ঞরা চালকের লাইসেন্স না থাকায় রাস্তায় দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। প্রশিক্ষণ বা যোগ্যতা যাচাই ছাড়া যে কেউ রিকশা নিয়ে নামতে পারলে ঝুঁকি থেকেই যাবে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ঈদের সময় ঢাকায় ঘটে যাওয়া ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ১৫ শতাংশ ঘটেছে ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে।
অন্যদিকে এলাকাভিত্তিক রিকশার সংখ্যা কীভাবে পরিমাপ হবে বিধিমালায় তা উল্লেখ নেই। ঢাকা দুই সিটির কোন জোনে কতটি রিকশা চলবে তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। এছাড়া কোন মানদণ্ডে, কোন জরিপে কোন নিয়মে তা করা হবে— এটা নিয়েও কার্যত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি কেন্দ্রীয় নিবন্ধন বা লাইসেন্সিং ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকায় ঠিক কত ব্যাটারি রিকশা চলছে, তার হিসাব না থাকায় এই কাজটি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং বলেও নগরবিদরা জানান।
বিধিমালায় আরও কয়েকটি ফাঁক রয়েছে। বর্তমান রিকশাকে নিবন্ধন পেতে হলে বুয়েটের অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কাঠামো বদলাতে হবে। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, বুয়েট নিজে রিকশা বদলাবে না, নকশা দিয়েছে; উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিয়ে এ কাজ করবে। কিন্তু লাখ লাখ রিকশা বদলের সময়সীমা, খরচ ও সক্ষমতা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। চার্জিং স্টেশন ও পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনায় নিয়মের কথা থাকলেও নিয়মিত অভিযানের পরিকল্পনাও জানানো হয়নি।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. মো. শামছুল হক জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ই-রিকশার বিধিমালা বাস্তবায়ন অনেকগুলো দিক থেকেই চ্যালেঞ্জিং। প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে— অবৈজ্ঞানিকভাবে তৈরিকৃত রাস্তায় থাকা পুরোনো রিকশাগুলোকে সরিয়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে নতুন রিকশা নামানো। কারন অলরেডি লাখ লাখ রিকশা রাস্তায় নেমে আছে এবং প্রতিদিনই নামছে। যদি এগুলোই কোনোভাবে সনদ নিয়ে নিবন্ধন করা হয় তাহলে একটা ভয়াবহ বিষয় হবে। মালিকরা কোনোভাবেই চাইবে না অলরেডি রাস্তায় থাকা রিকশাগুলো সরাতে। কারণ এখানে তাদের ইনভেস্টমেন্ট আছে। অন্যদিকে নীতিমালার আওতায় নতুন ই-রিকশা নামানো হওয়া মানে পুরোনোরগুলোর সাথে এই সংখ্যা আরও বাড়া। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, বাসের ফিটনেসের বিষয় আসলেই অতি পুরোনো বাসগুলো কিন্তু রাস্তা থেকে সরানো যায় না। তাই এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ক্ষেত্রেও বিষয়টা এমন হবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে জোনভিত্তিক রিকশা স্টেশন। এটা করা মানে রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হওয়া। কারণ এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যাত্রী ট্রান্সফার মানে ‘ট্রান্সফার স্টেশন’ করা। কিন্তু ঢাকার সড়কে এরকম পার্কিংয়ের জায়গা অনেকাংশেই নেই। ফলে সব মিলিয়ে বিধিমালাকে ‘কেতাবি গাইডলাইন’ মনে হয়েছে। এটা শুধু নিবন্ধনের মাধ্যমে একটা ইনকাম করা ছাড়া কিছুই মনে হয়নি।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গত ৩ নভেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ই-রিকশার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতিটি ১০০ টাকা মূল্যে আবেদন ফরম বিতরণ করা হচ্ছে। নগর ভবন ও ডিএসসিসির সকল আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে ফরম সংগ্রহ করার কথা সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘দক্ষিণে চারটি জোনে রিকশাগুলোর রং ঠিক করার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। তবে এখনও জোনভিত্তিক কতো রিকশা চলবে তার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। ৫ নভেম্বর (আজ) একটি মিটিং হবে সেখানে এটা সংখ্যা বলা হবে। পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা বাড়তেও পারে আবার কমতেও পারে।’ বুয়েটের সনদ নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরোনো রিকশাগুলো রি-মডেল করে মানে সনদ পাওয়ার জন্য উপযুক্ত যন্ত্রাংশ লাগিয়ে আপডেট করে আনলে নিবন্ধন দিতে আপত্তি নেই। এক্ষেত্রে বুয়েটের সনদ ছাড়া নিবন্ধন হবে না বলে তিনি উল্লেখ করেন। পর্যায়ক্রমে সব ই-রিকশাকে নিয়মের আওতায় এনে সড়কে অননুমোদিত ও অনুপযুক্ত যানবাহনের সংখ্যা কমিয়ে আনাই মূল লক্ষ্য বলেও তিনি জানান।
এই বিষয়ে ডিএনসিসির কার্যক্রম নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা জাকির জানান, উত্তর সিটি করপোরেশনে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে প্রাথমিক আলোচনার ভিত্তিতে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বুয়েটসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়েও আলোচনা চলছে। এখনো সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি। আপাতত মুদ্রিত কপিতে রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এসময় তিনি জোনভিত্তিক রিকশা চলাচলের সংখ্যা এখনও নির্ধারণ হয়নি বলে উল্লেখ করেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘নীতিমালার মাধ্যমে অটোরিকশার মান ও সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বদলে ঢাকার রাস্তায় চলাচল করা লাখ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ ও মানহীন অটোরিকশাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অথচ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, অটোরিকশার কারিগরি মান নিশ্চিত করা, সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।’
এসময় তিনি বুয়েটের সনদের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা পরীক্ষা ও সনদ দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিষয়টি জানিয়ে বলেন, ‘বুয়েট মূলত একটি একাডেমিক প্রতিষ্ঠান, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ নয়।’ তাই তিনি উপযুক্ত কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডের মাধ্যমে নিরাপদ অটোরিকশা চিহ্নিত করে বৈধতা দেওয়া এবং চলাচলের অনুপযোগী যানবাহন ধাপে ধাপে সড়ক থেকে সরিয়ে ফেলার বিষয়টি জোর দেন। এর সঙ্গে ট্রাফিক পুলিশের জনবল সংকট যুক্ত হওয়ায় গতি, নিরাপত্তা ও চলাচল নিয়ন্ত্রণও কঠিন হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।