জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ব্র্যান্ডের নাম বদলালেই কি মুছে যায় পুরোনো আইনি দায়? এয়ারটেল থেকে ‘সার্কেল’—নতুন পরিচয়ে যাত্রা শুরু করেছে রবি। কিন্তু নাম পরিবর্তন করেও কাটছে না একীভূতকরণের শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ। বরং এই বিরোধ গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটর বাংলালিংক রবির কাছে দাবি করেছে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ। প্রশ্ন উঠেছে, ১০ বছর আগে দেওয়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত কি উপেক্ষা করেছে রবি?
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৬ সালে। ওই বছরের ২৬ অক্টোবর রবি আজিয়াটা ও এয়ারটেলের একীভূতকরণে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি।
অনুমোদন প্রজ্ঞাপনের ২০ নম্বর শর্তে বলা হয়েছিল, একীভূতকরণের পর সব পণ্য ও সেবা বাজারজাত করতে হবে কেবল ‘রবি আজিয়াটা লিমিটেড’ নামে। কিন্তু অভিযোগ, এই নির্দেশনা উপেক্ষা করে রবি দীর্ঘদিন ধরে রবি ও এয়ারটেল-দুটি পৃথক ব্র্যান্ড পরিচালনা করেছে।
শুধু ব্র্যান্ড নয়, ‘০১৬’ নম্বর সিরিজ ব্যবহার নিয়েও রয়েছে আইনি জটিলতা। প্রতিযোগী অপারেটরগুলোর অভিযোগ, একীভূতকরণের অনুমোদনে নির্ধারিত সময়সীমা ও বিধিনিষেধের পরও বিটিআরসির নতুন অনুমোদন ছাড়াই নম্বর সিরিজটি ব্যবহার করে আসছে রবি।
এ নিয়ে প্রথমে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোন এবং ৩০ অক্টোবর বাংলালিংক বিটিআরসিতে লিখিত আবেদন করে। একীভূতকরণের শর্ত বাস্তবায়নের দাবি জানানো হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল হাইকোর্টে রিট করে বাংলালিংক।
এরপর ২০ মে রবির কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠায় বিটিআরসি। তবে প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া ব্যাখ্যার বিষয়টি প্রকাশ করেনি কমিশন।
আইনি বিরোধের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে গত ৮ জুলাই। ঢাকার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে রবির বিরুদ্ধে ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করে বাংলালিংক।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, এয়ারটেল ব্র্যান্ড চালু রাখা এবং অনুমোদন ছাড়া ০১৬ নম্বর সিরিজ ব্যবহারের মাধ্যমে রবি অন্যায্য বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়েছে। এতে বাংলালিংকসহ অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটর আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি মামলা দায়েরের তারিখ থেকে অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত বার্ষিক ১৫ শতাংশ সুদ এবং মামলার আনুষঙ্গিক খরচও দাবি করেছে বাংলালিংক। তবে আদালতে এই ক্ষতিপূরণের যৌক্তিকতা এবং আর্থিক ক্ষতির সঙ্গে রবির কর্মকাণ্ডের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক প্রমাণ করতে হবে বাদীপক্ষকে।
এরপর গত ১৭ আগস্ট এয়ারটেল ব্র্যান্ডের পরিবর্তে ‘সার্কেল’ নামে নতুন পরিচয় চালু করে রবি। প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এয়ারটেলের বিদ্যমান গ্রাহকদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে নতুন ব্র্যান্ডের আওতায় নেওয়া হয়েছে। তবে তাদের মোবাইল নম্বর, প্যাকেজ ও ব্যালান্স অপরিবর্তিত রয়েছে।
অর্থাৎ ব্র্যান্ডের নাম বদলেছে, কিন্তু গ্রাহকভিত্তি ও সেবার কাঠামোতে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
টেলিযোগাযোগ আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্র্যান্ডের নাম পরিবর্তন করলেই অতীতের আইনি ও চুক্তিগত দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। অন্যদিকে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, একীভূতকরণের শর্তে দুটি পৃথক প্রিফিক্স ব্যবহারের অনুমতি থাকলে অপারেটর তা ব্যবহার করতে পারবে। অন্যথায় পারবে না। বিষয়টি নিয়ে কমিশন আইনি সহায়তাকারীদের ব্যাখ্যা দিয়েছে।
বিটিআরসির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একীভূতকরণের শর্ত, এয়ারটেল ব্র্যান্ডের ব্যবহার এবং ০১৬ নম্বর সিরিজ নিয়ে অভিযোগগুলো আইনি ও লাইসেন্সিং বিভাগ পর্যালোচনা করছে।
এদিকে গ্রাহকস্বার্থ রক্ষায় পুরো বিষয়টি স্বচ্ছভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, একীভূতকরণের শর্ত বাস্তবায়ন, নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি, প্রতিযোগিতা এবং গ্রাহকসেবার মান নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, এয়ারটেলের জায়গায় ‘সার্কেল’ এলেও রবির সামনে এখনো বড় প্রশ্ন-২০১৬ সালের একীভূতকরণের শর্ত যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না। ১ হাজার ৯২০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা এবং ০১৬ নম্বর সিরিজের আইনি জটিলতার নিষ্পত্তি নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্ত ও বিটিআরসির পর্যালোচনার ওপর। —জা. অর্থনীতি/এলএটি