ধর্ম ও চিন্তা ডেস্ক: এইচএসসির ফলাফল এবার এইচএসসি পরীক্ষায় ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার হয়েছে। দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডেই পাসের হার কমেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। এর মধ্যে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ হাজার ৩১৩ জন। আর রাজধানীর ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ থেকেই জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১ হাজার ৩১১ জন; অর্থাৎ পুরো কুমিল্লা বোর্ডের চেয়ে মাত্র ২ জন কম জিপিএ-৫ পেয়েছেন ঢাকার এই কলেজের শিক্ষার্থীরা।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন তিন হাজার ১৫৬ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে অসুস্থতা ও বিভিন্ন কারণে চারজন সব পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। এ হিসাবে কলেজটির পাসের হার ৯৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী।
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়েছিলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের পূর্ব হাসনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম রাব্বি । এ দুর্ঘটনায় দুই হাত হারিয়েছিলেন তিনি। এর পর মুখ দিয়ে লিখে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দিয়েছেন। পরে শেখেন পা দিয়ে লেখা। এভাবেই তিনি মাধ্যমিকে পান জিপিএ-৫। এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়ও জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি।
রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। বজলুর রহমান পেশায় জাহাজভাঙা শ্রমিক ছিলেন। মা রোজি আক্তার দিনমজুরের কাজ করেন। তিন ভাই–বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।
রফিকুলের জীবনের বড় ধাক্কাটি আসে ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর। তখন তিনি ভাটিয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একটি পদচারী–সেতু পার হওয়ার সময় সেতুর সঙ্গে লাগানো বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পর তার দুই হাত কেটে ফেলতে হয়।
একই পরীক্ষায় লক্ষ্মীপুরের ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজনও পাস করতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যবহারকারীদের সে কি মন্তব্য! টিকটকই নাকি সর্বনাশের গোড়া। একজন তো লিখেছে, ‘যারা ফেল করছে তাদের প্রত্যেককে স্মার্ট ফোন কিনে দেওয়া হোক।’
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার নীলকান্ত সরকারি ডিগ্রি কলেজে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় চরম ফল বিপর্যয় ঘটেছে। কলেজটি থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট ৩০০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৭ জনই অকৃতকার্য হয়েছেন। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের প্রতিবাদে কলেজ প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যতিক্রমী অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় ছাত্রদল। সংগঠনের নেতাকর্মীরা কলেজে গিয়ে শিক্ষকদের হাতে ফুলের তোড়া তুলে দিয়ে এই অভিনব ‘প্রতিবাদ জানান’। তাদের মতে এই ভয়াবহ ব্যর্থতার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকরা কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
আনন্দ প্রকাশের ধরন নিয়ে আলোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া হওয়াই স্বাভাবিক। এ দায় কি কেবলই শিক্ষকদের। যারা ভালো ফল করেছে, তারা পরিশ্রম করেছে। অন্যরা সময়ের কাজ সময়ে করেনি। এর দায় আল্লাহ এবং শিক্ষকদের ওপর দিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এইচএসসির ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ নিয়েও নতুন করে ভাবতে শেখায়। রফিকুল ইসলামের দুই হাত হারিয়েও পা দিয়ে লিখে জিপিএ-৫ অর্জন প্রমাণ করে, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম থাকলে শারীরিক সীমাবদ্ধতাও সাফল্যের পথে বাধা হতে পারেনা । অন্যদিকে, গণহারে অকৃতকার্য হওয়ার দায় শুধু শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্রুপ করা কোনো সমাধান নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, কোনো জাতি নিজের অবস্থার পরিবর্তনে সচেষ্ট না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তাদের অবস্থার পরিবর্তন করেন না (সুরা আর-রাদ, আয়াত ১১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যা তোমার উপকারে আসে, তার জন্য সচেষ্ট হও এবং আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর; দুর্বলতা প্রকাশ করো না’ (সহিহ মুসলিম)। অতএব শিক্ষার্থীদের সময়ানুবর্তিতা, অধ্যবসায় ও আত্মশুদ্ধি, শিক্ষকদের আন্তরিক পাঠদান এবং অভিভাবকদের সচেতন তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। ব্যর্থদের প্রতি তিরস্কার নয়, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। তাওয়াক্কুলের অর্থ চেষ্টা পরিহার নয়; বরং যথাসাধ্য চেষ্টা করে আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
গ্রন্থনা: আবদুল মকিম চৌধুরী