Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 01:49 am

ইরান প্রশ্নে ফাটল ট্রাম্প শিবিরে

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ক্ষমতা হারানোর পর যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টিতে ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্য বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত বুধবার এক্সে দীর্ঘ এক পোস্টে লিখেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’ তার দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও আগের রাতে একই কথা বলেছেন। অথচ ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, তার কোনো অনুশোচনা নেই। সুযোগ পেলে আবারও একই কাজ করতেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

২০২৮ সালের সম্ভাব্য প্রার্থী ও ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলনের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্স সরাসরি যুদ্ধের রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেট হারানোটা যুদ্ধের যথার্থ মূল্য ছিল, কেউ এমন মনে করলে তাকে যুক্তি দিতে বলেছেন তিনি। নাম প্রকাশ না করা এক জরিপকারীর বরাতে ভ্যান্স জানান, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে এবার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকেছেন, এমন ভোটারদের শীর্ষ চার কারণের দুটি ছিল যুদ্ধের অবসান এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্বিবেচনা। বুধবার হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প ভ্যান্সের মূল্যায়নকে ‘অনেকাংশে সত্য’ বললেও দায় চাপিয়েছেন যুদ্ধজনিত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ওপর। একইসঙ্গে জোর দিয়েছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে ঠেকাতে যুদ্ধ অপরিহার্য ছিল।

সমালোচনার আরেকটি সুর এসেছে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের কট্টর অবস্থানের জন্য পরিচিত সিনেটর টেড ক্রুজের কাছ থেকে। তার মতে, যুদ্ধ হওয়া উচিত ছিল সংক্ষিপ্ত ও নির্ণায়ক, কিন্তু তা অতিরিক্ত দীর্ঘ হয়েছে। জুনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধোত্তর ইরান পুনর্গঠনে ৩০ হাজার কোটি ডলারের তহবিলের প্রস্তাব ছিল। ক্রুজসহ রক্ষণশীল আইনপ্রণেতারা একে ইরানি শাসকগোষ্ঠীকে বিপুল অর্থ তুলে দেওয়া বলে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তার ইঙ্গিত সম্ভবত সেদিকেই। যুদ্ধবিরতিসহ সেই চুক্তি অবশ্য দ্রুতই ভেঙে পড়ে।

এই দূরত্ব তৈরির পেছনে মূল কারণ ২০২৮-এর হিসাব। দুই মেয়াদ পূর্ণ করায় ট্রাম্প আর প্রার্থী হতে পারবেন না, ফলে উত্তরাধিকারের লড়াই এখনই শুরু হয়ে গেছে। কাতারে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধ নিয়ে দলের ভেতরে গুরুতর বিভাজন রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, মার্কিন করদাতাদের খরচ হয়েছে আনুমানিক ৪ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। তাই প্রার্থী হতে চাইলে যুদ্ধ থেকে দূরে থাকাই লাভজনক। মাসগ্রেভের বিশ্লেষণে ক্রুজ ও প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মতো যুদ্ধপন্থিরা দীর্ঘদিন এ যুদ্ধই চেয়েছিলেন। এখন তা দেশে-বিদেশে বিপর্যয় হয়ে দাঁড়ালেও তারা সরে আসতে পারছেন না, তাই কেবল যুদ্ধের দৈর্ঘ্য ও পরিচালনার সমালোচনা করছেন। অন্যদিকে ভ্যান্স দলের তুলনামূলক বিচ্ছিন্নতাবাদী অংশের প্রতিনিধি। ট্রাম্পের সমর্থকদের একটি বড় অংশের মন জিততে যুদ্ধ, এমনকি অন্যান্য বিদেশি প্রতিশ্রুতি থেকেও সরে আসতে তিনি প্রস্তুত।

এদিকে ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের অর্থের জোগান সীমিত করে এবং যুদ্ধ পরিচালনাকারীদের চাপে ফেলে এর লাগাম টানতে চাইছে। সিনেটের ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতা চাক শুমার বলেছেন, ‘এ যুদ্ধ শেষ হতে হবে।’ জনসম্মতি ছাড়া যুদ্ধে যাওয়া প্রেসিডেন্টকে ঠেকাতে সংবিধান-প্রণেতারা অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা কংগ্রেসকে দিয়েছিলেন, সে কথা তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। কংগ্রেস সদস্য রো খান্না ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সব যুদ্ধকার্যক্রমে অর্থায়ন নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব এনেছেন, যেভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। তবে রিপাবলিকান বিশ্লেষক জন ফিহারি মনে করিয়ে দেন, প্রতিরক্ষা বাজেট ও ঋণসীমা বাড়ানোর মতো বিষয়ে দুই দলের সমর্থন লাগবে। শুনানি ও তদন্তের ক্ষমতাও এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে, যা যুদ্ধকে অজনপ্রিয় করতে এবং শীর্ষ কয়েকজনকে বিব্রত বা বিদায় করতে পারে। বিশেষ চাপে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। বিদায়ী রিপাবলিকান সিনেটর থম টিলিস বলেছেন, ইরান যুদ্ধে ভূমিকার জন্য তাকে ‘জবাবদিহির মুখোমুখি’ হতে হবে। তবু রণপ্রস্তুতি থামেনি।

ভোটের দিন মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে হামলা চালায়, জুনের পর এটিই প্রথম। মার্কিন কর্মকর্তারা একে ‘প্রতিরক্ষামূলক’ বলেছেন। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর, বুধবারের মধ্যে তিনটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরি অঞ্চলটিতে পৌঁছালে সেন্টকম নতুন হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল। গালফ স্টেট অ্যানালিটিক্সের প্রধান নির্বাহী জর্জিও কাফিয়েরোর আশঙ্কা, ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতা নেওয়ার আগের মাসগুলোকে, অর্থাৎ ২০২৭ সালের জানুয়ারির আগ পর্যন্ত সময়কে, ট্রাম্প আক্রমণাত্মক হওয়ার সুযোগ ভাবতে পারেন। যদিও ট্রাম্প ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, আপাতত নতুন হামলার পরিকল্পনা নেই। কাতারের মধ্যস্থতায় আলোচনা চলছে, তবে কাফিয়েরোর মতে, দুই পক্ষ আপসে রাজি না হলে তা সফল হবে না।