মো. মতিউর রহমান, ঢাকা: দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজে এখনও নিজস্ব হাসপাতাল ভবন নির্মিত হয়নি। এগুলোর কোনোটি সর্বোচ্চ ১৮ বছর, কোনোটি সর্বনিম্ন ৮ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত। এসব মেডিকেল কলেজের জন্য ২১২ থেকে ২৫০ শয্যার হাসপাতালের অনুমোদনও আছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ও ক্লিনিক্যাল শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছেন জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতালের ওপর ভর করে। কয়েকটি মেডিকেল কলেজ থেকে একাধিক ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এরই মধ্যে এমবিবিএস ডিগ্রিও অর্জন করেছেন। তবে নিজস্ব হাসপাতালের অভাবে কারণে তাদের জটিল রোগের চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হয়েছে বলে আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।
চিকিৎসা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মেডিকেল কলেজের শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হাসপাতালে সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে এসে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নেওয়া। কিন্তু নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় এসব কলেজের শিক্ষার্থীদের অন্য হাসপাতালে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে। জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ থাকলেও জটিল রোগ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ তুলনামূলক সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীদের সব ধরনের রোগ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে ঘাটতি থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব চিকিৎসাসেবার মানের ওপরও পড়তে পারে।
অবশ্য সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, নিজস্ব হাসপাতাল না থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থায় শিক্ষা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতালে পর্যাপ্ত রোগী থাকায় শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে তারাও নিজস্ব হাসপাতাল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন।
দেড় যুগেও হাসপাতাল পায়নি কয়েকটি কলেজ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পাবনা, নোয়াখালী ও কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৫০ শয্যার হাসপাতাল অনুমোদিত থাকলেও এখনও নিজস্ব হাসপাতাল ভবন নির্মিত হয়নি।
এরপর ২০১১ সালে যশোর মেডিকেল কলেজ এবং ২০১৪ সালে জামালপুর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এ দুটি কলেজের জন্য যথাক্রমে ২৭৮ ও ২৫০ শয্যার হাসপাতাল অনুমোদিত রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানেও নিজস্ব হাসপাতাল ভবন গড়ে ওঠেনি।
একই অবস্থা ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত রাঙামাটি মেডিকেল কলেজ এবং ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের। এ ছাড়া ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নীলফামারী, নেত্রকোনা, নওগাঁ, মাগুরা ও চাঁদপুর মেডিকেল কলেজেরও নিজস্ব হাসপাতাল ভবন নেই।
এর মধ্যে রাঙামাটি, হবিগঞ্জ, নীলফামারী, নওগাঁ, মাগুরা ও চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের জন্য ২৫০ শয্যার হাসপাতাল অনুমোদিত রয়েছে। নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজের জন্য অনুমোদিত হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ২১২।
ফলে এসব মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জেলা সদর বা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে ব্যবহারিক ও ক্লিনিক্যাল শিক্ষা নিতে হচ্ছে। কোনো কোনো কলেজের অস্থায়ী ক্যাম্পাসও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের আশপাশে স্থাপন করা হয়েছে।
ব্যবহারিক শিক্ষায় ঘাটতির আশঙ্কা
চিকিৎসা শিক্ষায় তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের গুরুত্ব অপরিসীম। সাধারণত এমবিবিএস কোর্সের তৃতীয় বর্ষ থেকে শিক্ষার্থীরা সরাসরি রোগীর সংস্পর্শে এসে বিভিন্ন রোগের লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে রোগী পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া শেখা এবং চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া তাদের প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ জন্য একটি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতাল থাকা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পাঁচ বছরের এমবিবিএস কোর্স শেষ করার পর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সাময়িক নিবন্ধন নিয়ে এক বছরের বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ করতে হয়। এই প্রশিক্ষণ সফলভাবে শেষ করার পর চিকিৎসক হিসেবে স্থায়ী নিবন্ধন পাওয়া যায়।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতালে সাধারণ রোগের চিকিৎসা বেশি হলেও সব ধরনের জটিল রোগ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে না। ফলে এসব হাসপাতালে প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের রোগী ও চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ সীমিত হতে পারে।
বিকল্প ব্যবস্থায় চলছে শিক্ষা কার্যক্রম
মাগুরা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. কামরুল হাসান বলেন, কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল ভবন না থাকলেও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট মাগুরা জেনারেল হাসপাতালকে অস্থায়ী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতালটির একটি অংশে কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, হাসপাতালটিতে রোগীর চাপ বেশি থাকায় শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক ও ক্লিনিক্যাল শিক্ষা গ্রহণে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে একটি মেডিকেল কলেজের জন্য নিজস্ব হাসপাতাল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নিজস্ব হাসপাতাল ও ক্যাম্পাস নির্মাণের অগ্রগতি সম্পর্কে অধ্যাপক কামরুল হাসান বলেন, এ জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি। এটি শতকোটি টাকার বড় প্রকল্প হওয়ায় প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমোদন পাওয়া গেলে নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ডা. মো. হারুন-অর-রশিদ বলেন, নিজস্ব ক্যাম্পাস ও হাসপাতাল ভবন না থাকলেও বর্তমানে কলেজটির একাডেমিক ও ক্লিনিক্যাল শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় বড় কোনো সংকট নেই।
তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা চাঁদপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে রোগী দেখে ব্যবহারিক শিক্ষা নিচ্ছেন। তাদের জন্য আলাদাভাবে ল্যাবরেটরি সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য হোস্টেল এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় কয়েকটি ভবন ভাড়া নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহযোগিতায় কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণের বিষয়ে অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদ বলেন, কলেজের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব আগেই অনুমোদিত হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন নতুন ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। আগামী চার মাসের মধ্যে নতুন অবকাঠামো দৃশ্যমান হবে বলে আশা করছেন তারা।
হাসপাতাল নির্মাণে অগ্রাধিকার দেওয়ার তাগিদ
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, যেসব সরকারি মেডিকেল কলেজের নিজস্ব হাসপাতাল নেই, সরকারের উচিত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেগুলোর হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা। নিজস্ব হাসপাতাল না থাকলে শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষায় ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তিনি বলেন, এসব কলেজের শিক্ষার্থীকে অনেক ক্ষেত্রে বাসে গাদাগাদি করে জেলা সদর বা জেনারেল হাসপাতালে যেতে হয়। সেখানে জটিল রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় তারা সব ধরনের রোগ ও চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ পান না।
সমস্যা সমাধানে স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন এই জনস্বাস্থ্যবিদ। তিনি বলেন, প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একত্র করে সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক জ্ঞান ও চিকিৎসাগত দক্ষতা বাড়ানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সমন্বিত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে
স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মাজহারুল ইসলাম বলেন, নিজস্ব হাসপাতাল ভবন ও স্থায়ী ক্যাম্পাস না থাকা সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ প্রায় শেষ হয়েছে।
তিনি জানান, আগে এসব মেডিকেল কলেজের জন্য পৃথক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে জমি নির্বাচন ও অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতায় সেগুলো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। এখন সব কলেজের জন্য সমন্বিত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুত তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তিনি।
বর্তমান শিক্ষা কার্যক্রম সম্পর্কে অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম বলেন, নিজস্ব হাসপাতাল না থাকায় সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরা জেলা সদর ও জেনারেল হাসপাতালের ওপর নির্ভর করছেন। অনেক ক্ষেত্রে ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতালকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। এসব হাসপাতালেই শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা চলছে। কোনো কোনো কলেজের অস্থায়ী ক্যাম্পাসও হাসপাতালের আশপাশে স্থাপন করা হয়েছে।
তবে সমন্বিত প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর কবে অনুমোদন মিলবে এবং হাসপাতাল নির্মাণের কাজ কবে শুরু হবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানাননি স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা।