নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতে এ প্রযুক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পের কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলা জরুরি। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী এআই ইকো-সিস্টেম গঠনের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, এআইয়ের সুফল পেতে শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, গবেষণায় বিনিয়োগ, স্থানীয় উদ্ভাবনের বাণিজ্যিক প্রয়োগ এবং সহায়ক নীতিমালা নিশ্চিত করতে হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে দেশে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ‘এআই-ফিকেশন ফর টুমরোজ ইকোনমি’ প্রতিপাদ্যে দিনব্যাপী এ সামিট আয়োজন করে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেন, এআইকে কেবল ব্যয় কমানোর হাতিয়ার নয়, বরং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শিল্পের আধুনিকায়ন, নতুন পণ্য ও সেবা উদ্ভাবন এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস দুলু এবং ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে বিষয়ভিত্তিক তিনটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সেশনের বিষয় ছিল ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার রূপান্তর মোকাবিলা: প্রয়োগ, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’। ঢাকা চেম্বার সভাপতি তাসকীন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেশনটিতে আলোচকরা বলেন, এআই বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনছে। ব্যবসা পরিচালনা, শিল্প উৎপাদন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে এর প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশেও ডিজিটাল সেবা, স্বয়ংক্রিয়করণ, তথ্যনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়িক সমাধানের ব্যবহার বাড়ছে। তবে সীমিত প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দক্ষ পেশাজীবীর অভাব, উচ্চ বাস্তবায়ন ব্যয় এবং সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ এ অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
দ্বিতীয় সেশনের শিরোনাম ছিল ‘শিল্প ও শিক্ষার মধ্যকার সংযোগ: ব্যবসায়িক উদ্ভাবনে এআই-এর প্রয়োগ’। ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে অনেক মেধাবী তরুণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন এবং বিনিয়োগ করছেন। তাদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও বিনিয়োগ দেশে কাজে লাগাতে বর্তমান সরকার একটি কার্যকর ইকো-সিস্টেম গড়ে তুলতে চায়। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও মেশিন লার্নিংকে কেবল আলোচনার বিষয় হিসেবে না রেখে দেশের বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজে লাগাতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে দেশের সব অঞ্চল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
সেশনে আরও বক্তব্য দেন ট্রান্সকম লিমিটেডের গ্রুপ সিইও সিমিন রহমান, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও তথ্যপ্রযুক্তি) ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আব্দুর রাজ্জাক, ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর সিইও রাইসুল কবির, মার্কপোলোর সিইও তাসফিয়া তাসবীন, পাঠাওয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম আহমেদ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ উদ্ভাবকরা।
তৃতীয় সেশনের বিষয় ছিল ‘সবার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: স্থানীয় মেধা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক সমস্যার সমাধানে করণীয় নির্ধারণ’। সেশনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে এআইয়ের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে এআই এজেন্ট ও অ্যাপ্লিকেশনগুলোকে দেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একইসঙ্গে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। স্থানীয়ভাবে তৈরি এআই অ্যাপ্লিকেশনের ব্যবহার ও বাজার সম্প্রসারণে কূটনৈতিক আলোচনা এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।
সমাপনী সেশনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে দেশে একটি ‘ন্যাশনাল এআই ইকো-সিস্টেম’ গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে গবেষণা, শিক্ষা, বিনিয়োগ ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি নীতিসহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
সামিট উপলক্ষে আয়োজিত ‘এআই বিজনেস এক্সপো’তে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তারা এআইভিত্তিক পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করেন। প্রদর্শনীতে দেশের ২০টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তারা নিজেদের উদ্ভাবিত পণ্য ও প্রযুক্তি তুলে ধরেন।
সামিটে দেশি-বিদেশি ১২৪টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় বলে জানিয়েছে আয়োজকরা। এতে যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের প্রদর্শকরাও অংশ নেন। দেশের বিভিন্ন প্রযুক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তরুণ উদ্যোক্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্ভাবকদের অংশগ্রহণ সামিটে নতুন মাত্রা যোগ করে। আয়োজনের অংশ হিসেবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তিগত সমাধান খুঁজে পেতে বিজনেস ম্যাচমেকিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়।