ডেভিড হার্স্ট: ৯ মাসের মাথায় শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গেছে। তবে এই পরিবর্তন ইরানে নয়, ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই। টেক্সাস, মিশিগান, কানসাস, জর্জিয়া, ফ্লোরিডা এবং মার্কিন কংগ্রেসে।
ইরানে সরকার পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া। তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও সেই পরিকল্পনায় যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। বরং ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরান সম্পর্কে ট্রাম্পের তেমন কোনো ধারণাই ছিল না। নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় তিনি এমন একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন যা ছিল তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। অন্যদিকে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতাচ্যুত করার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের মতো সহজে ইরানকে পরাস্ত করা সম্ভব হবে এমন ধারণা ছিল তাদের বড় ভুল।
তবে ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকটই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পরিবর্তনের একমাত্র কারণ নয়।
গাজাই হয়ে উঠল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ
ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পেছনে ডেমোক্রেটিক পার্টিরও বড় দায় ছিল। জো বাইডেনকে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া এবং পরে তার সরে যাওয়ার পর কমলা হ্যারিসকে প্রার্থী করা ছিল দলটির বড় রাজনৈতিক ভুল।
বাইডেন ও কমলা হ্যারিসের প্রশাসন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করেছে এবং অস্ত্র সরবরাহ করেছে। গাজায় বেসামরিক মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য বিশ্ববাসী সরাসরি দেখেছে। এসব ছবি যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলকে ‘আত্মরক্ষার অধিকার’ দেওয়ার বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। ফলে ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থকদের মধ্যেও ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকে।
গাজা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ মিশিগানের সিনেটর নির্বাচিত আবদুল এল-সায়েদের বিজয়।
নির্বাচনি প্রচারের শুরুতে তাকে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স তাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক বলে প্রচার করেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলোর অনেকেও এসব অভিযোগ প্রচার করেছে।
ইসরায়েলপন্থি সংগঠন আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপ্যাক) তাকে হারাতে প্রাইমারিতে ৩ কোটি ডলার ব্যয় করে। পরে নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী রজার্সের পক্ষে আরও ৯০ লাখ ডলার খরচ করে। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও সায়েদ জয়ী হন।
এই জয় শুধু একজন রাজনীতিকের বিজয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলনীতির বিরুদ্ধে জনমতের বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তিন বছর আগেও দেশটির রাজনীতিতে এমন পরিবর্তন কল্পনা করা কঠিন ছিল।
ডেমোক্র্যাটদেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে
তবে ডেমোক্রেটিক পার্টি এখনই ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন পুরোপুরি প্রত্যাহার করবে এমনটা ভাবার কারণ নেই। নতুন কংগ্রেসের অনেক সদস্যই ইসরায়েলের অস্তিত্ব ও ইহুদিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে।
কংগ্রেস সদস্য রো খান্না ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, ইসরায়েলকে শর্তহীন সামরিক সহায়তা বন্ধ করা এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পক্ষে কথা বলেছেন। কিন্তু তিনিও ইসরায়েলের অস্তিত্বের অধিকার সমর্থন করেন।
অর্থাৎ নতুন ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বের কাছ থেকেও ইসরায়েলি দখলদারিত্ব ও বৈষম্যমূলক নীতির অবসানে বড় কোনো পদক্ষেপ আশা করা কঠিন। তবে রাজনীতিকদের অবস্থানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসা জনমত। ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে বিশ্বজুড়ে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে তা সহজে থামবে না।
শুধু গাজায় ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো কিংবা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা কিছুটা কমানো যথেষ্ট নয়। দখলদারিত্ব ও অবরোধ অব্যাহত থাকলে আন্দোলনও চলবে।
ট্রাম্পের জন্য কঠিন বার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আমদানি শুল্ক এবং বিদেশে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা রিপাবলিকানদের জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সম্পর্কও এখন প্রশ্নের মুখে। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ‘মাগা’ আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি হয়েছে। টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসনের মতো পরিচিত ব্যক্তিরা ইতোমধ্যে ট্রাম্পের বিরোধিতা করছেন।
ট্রাম্প অবশ্য এখনও মনে করেন দেশের ভেতরে ও বাইরে কী হবে তা একমাত্র তিনিই ঠিক করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো তাকে বেশ কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখতে হয়। শেয়ারবাজার, জ্বালানি তেলের দাম, ফক্স নিউজের অবস্থান এবং নিজের রাজনৈতিক উত্তরসূরি নিয়ে অনিশ্চয়তা— সবই তাকে চাপে রাখছে।
নির্বাচনে নিজের নাম ছিল না বলে দায় এড়ানোর সুযোগও তার নেই। তিনি ৩০টি নির্বাচনি সমাবেশ করেছেন। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের সমর্থন দিয়েছেন এবং অন্যদের নির্বাচনি লড়াই থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তার সমর্থিত অনেক প্রার্থীই পরাজিত হয়েছেন।
ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসা নিয়ে তদন্ত
নতুন কংগ্রেসে ট্রাম্প পরিবারের আর্থিক কর্মকাণ্ডও কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে পারে। প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি কমিটির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান রবার্ট গার্সিয়া ইতোমধ্যে ট্রাম্পকে আইনি প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ট্রাম্প পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ট্রাম্পের ছেলেদের প্রতিষ্ঠিত ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যানশিয়ালের চুক্তি। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের শপথের চার দিন আগে আমিরাত-সমর্থিত বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠানটির ৪৯ শতাংশ মালিকানা কিনতে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই অর্থের ১৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে যায়। বিষয়টি নিয়ে নতুন কংগ্রেসে তদন্তের দাবি উঠতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্যও সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ ও রাজনৈতিক পুঁজি ব্যয় করেছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলের ধনী দেশগুলোর নিরাপত্তার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না তা তারা বুঝতে পেরেছে।
এখন তাদের আঞ্চলিক সহযোগিতা ও পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিজেদের দেশের কৌশলগত পরিকল্পনায় ট্রাম্পের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করেছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
ইউরোপের দেশগুলোর জন্যও এটি একটি পরীক্ষা। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বিষয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বাইরে গিয়ে নিজস্ব অবস্থান নিতে পারে কি না সেটিই দেখার বিষয়।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে শুধু প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল যুক্তরাজ্যের রাজনীতির জন্যও একটি বার্তা। ফিলিস্তিন ও আরব বিশ্বের মানুষের কাছে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাস্তবে কোনো পরিবর্তন না আনলে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। ইসরায়েলের দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে শুধু বক্তব্য দিলেই হবে না— কার্যকর পদক্ষেপও নিতে হবে। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলার পাশাপাশি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বাধা দূর করতে হবে।
বাস্তবতা হলো ইসরায়েলের রাজনীতিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ফলে মুখে শান্তির কথা বলে বাস্তবে দখলদারিত্বকে মেনে নেওয়ার সুযোগ আর আগের মতো নেই। গাজায় ইসরায়েলের হামলা, ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ এবং বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের যে ঢেউ তৈরি হয়েছে তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সেই পরিবর্তনেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক
মিডল ইস্ট আই থেকে ভাষান্তর ও সম্পাদনা: মাহবুবুল হাসান