Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 02:28 am

২০০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ

image

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের তৈরি পোশাক খাতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চলমান শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা সৃষ্টিতে উসকানি ও অর্থায়নের অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে। গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বেক্সিমকো, সেপাল, এনভয়, রেনেসাঁ, হামিদ, ফেবিয়ান, তুসুকা, ওয়েল, নিপা, স্ট্যান্ডার্ড, গিভেন্সি ও মন্ডল গ্রুপসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব শিল্পগোষ্ঠীর মালিক, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাসহ দুই শতাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ, তল্লাশি ও লেনদেনের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এর মধ্যে বেশ কিছু হিসাব জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, শ্রমিক আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে অর্থায়ন ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আন্দোলনের আড়ালে পরিকল্পিতভাবে পোশাক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। এ কাজে কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর মালিক ও আওয়ামী লীগের কিছু নেতার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব শনাক্ত, লেনদেনের তথ্য সরবরাহ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে হিসাব স্থগিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তবে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে যাতে বিঘ্ন না ঘটে সে জন্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হিসাব জব্দ না করে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

তালিকায় ১২ শিল্পগোষ্ঠী
এনবিআর সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পোশাক খাতে অস্থিরতায় অর্থায়নের অভিযোগসংক্রান্ত তালিকায় রয়েছে দেশের ১২টি শিল্পগোষ্ঠী। এর মধ্যে অন্যতম বেক্সিমকো গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা এবং ঢাকা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় হত্যার অভিযোগে করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচার ও ঋণসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগেও মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তালিকায় থাকা সেপাল গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। এনভয় গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী। এনভয় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তালিকায়। এগুলো হলো এনভয় গার্মেন্টস, এনভয় প্যাকেজেস, এনভয় ডিজাইন, এনভয় ফ্যাশনস ও এনভয় টেকনোলজি।

এনভয় গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে আবদুস সালাম মুর্শেদী, শারমিন সালাম ও শেহরিন সালামের নাম এসেছে। তবে প্রাপ্ত তথ্যে এনভয় গ্রুপের সঙ্গে শেলটেক গ্রুপের কুতুবউদ্দিন আহমেদ, তানভীর আহমেদ, সুমাইয়া আহমেদ ও রাশিদা আহমেদের নামও যুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এই চার ব্যক্তি ২০২২ সালেই এনভয় গ্রুপ থেকে বেরিয়ে গেছেন। ফলে তাদের বর্তমান সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তালিকায় আরও রয়েছে সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেনেসাঁ গ্রুপ, সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হামিদ গ্রুপ এবং সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফেবিয়ান গ্রুপ।

তুসুকা গ্রুপের একাধিক প্রতিষ্ঠানের নামও রয়েছে তালিকায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে তুসুকা প্যাকেজিং, তুসুকা স্টিচেস, তুসুকা অ্যাপারেলস, তুসুকা ফ্যাশনস, তুসুকা ওয়াশিং, তুসুকা প্রসেসিং, তুসুকা ডেনিম, তুসুকা জিনস ও তুসুকা ট্রাউজার্স।

এই গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে ফিরোজ আলম, মো. রাফায়েত উল্লাহ খান, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. ইকবাল কবির, সাবেক সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমান, আরশাদ জামাল, একরামুল হক ও মো. আতিউজ্জামানের নাম এসেছে।

ওয়েল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবদুস ছালামের নামও রয়েছে তালিকায়। এ ছাড়া নিপা গ্রুপের নিপা নিটওয়্যার কোম্পানি, সেলিনা অ্যাপারেলস ও নিপা ফ্যাশন ওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির নাম রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে সঞ্জীব চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য মো. খসরু চৌধুরী, এম মুনিরুল ইসলাম ও মো. টিপু সুলতানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

তালিকায় অ্যাক্সিস নিটওয়্যারস লিমিটেডের পরিচালক জাহিদ আহমেদ টুলুর নামও রয়েছে।

স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজের পাশাপাশি দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও সাগর ইনফো বিল্ডার্স লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগের নাম রয়েছে। এ গ্রুপের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে হোসনা আরা বেগম, মো. আতিউর রহমান, মাহমুদা বেগম, এ কে এম মোশাররফ হোসেন, তাসমিয়া রহমান, হাসনাত মোশাররফ, ফারিয়া রহমান, ফাহিম মোশাররফ ও হাসিব মোশাররফের নাম এসেছে।

গিভেন্সি গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে তালিকায়। এগুলো হলো গিভেন্সি গার্মেন্টস, গিভেন্সি স্পিনিং মিলস, গিভেন্সি গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং এবং গিভেন্স ফুডস অ্যান্ড অ্যাসেনশিয়াল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে আবদুল জাহিদ মুকুল, মাসুমা খাতুন, মাহমুদা খাতুন ও আবদুল হাদির নাম রয়েছে।

মন্ডল গ্রুপের ২৮ প্রতিষ্ঠান
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি তালিকায় মন্ডল গ্রুপের ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মন্ডল ইন্টিমেটস, কটন ফিল্ড (বিডি), কটন ক্লাব (বিডি), কটন ক্লোদিং (বিডি), মন্ডল ফেব্রিকস, ট্রপিক্যাল নিটেক্স, মার্ক সোয়েটার, মন্ডল স্পিনিং মিলস, মন্ডল ফার্মিং অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং, আলিম নিট, মন্ডল সিকিউরিটিজ, অ্যাপোলো ফ্যাশন, ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল, ইকো ইন্টিমেটস, অ্যাপোলো নিটওয়্যার, মন্ডল নিট কম্পোজিট, মন্ডল নিটওয়্যারস ও মন্ডল ইয়ার্ন ডাইং।

এ ছাড়া পানামা অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স, জিগজ্যাগ স্টুডিও, মন্ডল অ্যান্ড কোম্পানি ও মনটেক্স ফেব্রিকসসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে।

মন্ডল গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে আবদুল আলিম মন্ডল, তারিন তাসলিমা, মো. জুবায়ের মন্ডল, সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, আবদুল মান্নান মন্ডল, মোমেনা খাতুন, আবদুল মোমিন মন্ডল, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস ও আবদুল মজিদ মন্ডলের নাম রয়েছে।

রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
পোশাক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে এসেছে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। এতে দাবি করা হয়েছে, দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য বাহাউদ্দিন নাছিম অন্তত সাত থেকে আটজন নেতার সঙ্গে সমন্বয় করে শ্রমিক আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে বহিরাগত ব্যক্তিদের যুক্ত করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পোশাক খাতে অস্থিরতা বাড়িয়ে সরকারকে চাপে ফেলা। এ জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, আন্দোলন পরিচালনা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা দিতে টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করা হয়েছে। এসব যোগাযোগমাধ্যমে নির্দেশনা আদান-প্রদানের তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট বার্তা, যোগাযোগের নথি বা ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, অস্থিরতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে দেওয়া অর্থের একটি অংশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে। এসব অর্থের উৎস, প্রাপক ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য শনাক্ত করতে আর্থিক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এ ছাড়া রাজধানীর মিরপুর এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচি ও শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।

তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নজরদারিতে আরও ১২৫ প্রতিষ্ঠান
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, চিহ্নিত শিল্পগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক নেতাদের বাইরে আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন নিয়ে সন্দেহ রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। এর মধ্যে অন্তত ১২৫টি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন এবং সন্দেহজনক অর্থ স্থানান্তরের তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র রয়েছে কি না তা যাচাই করা হচ্ছে।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের হিসাব শনাক্ত এবং লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের পাশাপাশি কিছু হিসাবের লেনদেন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয় রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, তা বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।

তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কারও নাম থাকা বা ব্যাংক হিসাবের লেনদেন তদন্তের আওতায় আসার অর্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আর্থিক লেনদেনের তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।