Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 02:41 am

মুনাফায় এগিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংক, লোকসানে প্রথম প্রজন্ম (ভিডিও)

image

সাইদুর রহমান নোমান, ঢাকা: দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন সংরক্ষণের চাপের মধ্যে মুনাফায় বড় ধরনের বৈষম্য দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) প্রথম প্রজন্মের ৯টি বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে পাঁচটি বড় অঙ্কের লোকসান করেছে। বিপরীতে দ্বিতীয় প্রজন্মের সাতটি ব্যাংকের সব কটি মুনাফায় রয়েছে। তৃতীয় প্রজন্মের ১০টি ব্যাংকের মধ্যে আটটি মুনাফা করলেও লোকসান করেছে দুটি। সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ, ঋণের সুদ ও কমিশন আয় কয়েকটি ব্যাংকের মুনাফা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ ও পরিচালন ব্যয় কিছু ব্যাংককে লোকসানে ঠেলে দিয়েছে।

 

ব্যাংকগুলোর প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। প্রথম প্রজন্মের পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৭১৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। বিপরীতে একই প্রজন্মের চার ব্যাংক মোট ২ হাজার ৯২৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে। ফলে প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, প্রথম প্রজন্মের ৯ ব্যাংকের সম্মিলিত নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৯১ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রজন্মের সাত ব্যাংকের মোট নিট মুনাফা হয়েছে ২ হাজার ৭৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তৃতীয় প্রজন্মের আটটি লাভজনক ব্যাংকের সম্মিলিত মুনাফা ৪ হাজার ১২১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। একই প্রজন্মের লোকসানে থাকা দুটি ব্যাংকের ক্ষতি বাদ দিলে নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি ৭ লাখ টাকা।

তবে ব্যাংকগুলোর কোনো কোনোটির আর্থিক ফলাফল একক এবং কোনোটির সমন্বিত ভিত্তিতে প্রকাশিত হওয়ায় এসব যোগফলকে প্রজন্মভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ ও সরাসরি তুলনাযোগ্য ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

প্রথম প্রজন্মের পাঁচ ব্যাংকের লোকসান ১১,৭১৫ কোটি টাকা
প্রথম প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩ হাজার ১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা লোকসান করেছে ন্যাশনাল ব্যাংক।

এ ছাড়া এবি ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৮১৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ২ হাজার ৫০৭ কোটি ১৫ লাখ এবং আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের ৭০ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

একই সময়ে প্রথম প্রজন্মের চারটি ব্যাংক মুনাফা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে পূবালী ব্যাংক। ব্যাংকটির সমন্বিত ভিত্তিতে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৫৮৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সিটি ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ৮৬৭ কোটি, উত্তরা ব্যাংকের ৪৩০ কোটি ৫৯ লাখ এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ৪১ কোটি টাকা।

লাভজনক ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে বিনিয়োগ এবং কমিশন ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন থেকে আয় মুনাফায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

প্রথম ৯ মাসে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে সিটি ব্যাংকের আয় হয়েছে ৩ হাজার ২ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ২২৭ কোটি টাকা। ঋণের সুদ আয় বেড়েছে ২২৯ কোটি টাকা। একই সময়ে আমানতের সুদ ব্যয় বেড়েছে ৭৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রকাশিত হিসাবে নিট সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ৩২৪ কোটি টাকা।

অন্যদিকে পূবালী ব্যাংকের কমিশন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ও ব্রোকারেজ খাত থেকে আয় হয়েছে ৪ হাজার ২০৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। সরকারি সিকিউরিটিজ ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকেও ব্যাংকটির আয় বেড়েছে।

দ্বিতীয় প্রজন্মের সাত ব্যাংকই মুনাফায়
দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রথম ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে প্রাইম ব্যাংক। একক হিসাবে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৬৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ৬৬৪ কোটি ১ লাখ টাকা।

এরপর রয়েছে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক। ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৬২৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এ ছাড়া এনসিসি ব্যাংক ৩৩৪ কোটি ৬৬ লাখ, সাউথইস্ট ব্যাংক ২৭৯ কোটি ৩ লাখ, ঢাকা ব্যাংক ১০৮ কোটি ৯ লাখ এবং আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক ১০০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে।

এই সাত ব্যাংকের সম্মিলিত মুনাফা ২ হাজার ৭৯১ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঋণ ও বিনিয়োগের সুদ আয়ের পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজ, সুকুক, কমিশন এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন থেকে আয় তাদের মুনাফায় অবদান রেখেছে।

ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের ঋণ থেকে মোট সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ৯৯৯ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। আমানতের সুদ ব্যয়সহ সংশ্লিষ্ট হিসাব সমন্বয়ের পর ব্যাংকটির নিট সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ট্রেজারি ও সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা।

ইস্টার্ন ব্যাংকের ঋণ থেকে সুদ আয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৬৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা। ট্রেজারি ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে আয় ১ হাজার ৮৪৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। কমিশন, ঋণপত্র (এলসি) ও বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে ব্যাংকটি আয় করেছে ৫০৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

প্রাইম ব্যাংকের ঋণ থেকে সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ৫৬৯ কোটি ১১ লাখ টাকা। ট্রেজারি ও সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয় ১ হাজার ৬৩১ কোটি ৭২ লাখ টাকা। কমিশন, ব্রোকারেজ ও বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় থেকে আরও ২৫১ কোটি ৯৩ লাখ টাকা আয় করেছে ব্যাংকটি।

তবে সব ব্যাংকের মূল ঋণ কার্যক্রম থেকে আয় ইতিবাচক নয়। সাউথইস্ট ব্যাংকের ঋণ থেকে সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ২৮৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা। বিপরীতে আমানতের সুদ ব্যয় ছিল ২ হাজার ৬৫৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ শুধু এ দুটি খাতের হিসাবে সুদ ব্যয় আয়ের চেয়ে ৩৭০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বেশি। তবে ট্রেজারি ও বন্ডে বিনিয়োগ এবং কমিশন ও ব্রোকারেজ খাতের আয় ব্যাংকটির সামগ্রিক মুনাফায় অবদান রেখেছে।

দ্বিতীয় প্রজন্মের আট ব্যাংকের মধ্যে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংককে এ হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে। ব্যাংকটি একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অংশ হওয়ায় এর স্বতন্ত্র আর্থিক ফলাফল অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

তৃতীয় প্রজন্মে সর্বোচ্চ মুনাফা ব্র্যাক ব্যাংকের
তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোর মধ্যে মুনাফায় শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত ভিত্তিতে কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ২ হাজার ১২১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে মুনাফা ছিল ১ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ।

এরপর রয়েছে যমুনা ব্যাংক। ব্যাংকটির সমন্বিত নিট মুনাফা হয়েছে ৫০১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। ব্যাংক এশিয়ার মুনাফা ৪৭২ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

এ ছাড়া শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৪৪৪ কোটি ৭২ লাখ, ট্রাস্ট ব্যাংক ২২৬ কোটি ৩৭ লাখ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ২১৩ কোটি ৭ লাখ, ওয়ান ব্যাংক ৯৪ কোটি ৪৪ লাখ এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংক ৪৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা নিট মুনাফা করেছে।

অন্যদিকে তৃতীয় প্রজন্মের দুটি ব্যাংক লোকসানে রয়েছে। এর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংকের সমন্বিত নিট লোকসান হয়েছে ১৫৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। একক ভিত্তিতে লোকসান ১২৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ১২৩ কোটি ৮ লাখ টাকা।

প্রিমিয়ার ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ৩৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটি ১ হাজার ১১২ কোটি ৮১ লাখ টাকা প্রভিশন সংরক্ষণ করেছে। ফলে পরিচালন মুনাফা থাকলেও শেষ পর্যন্ত ব্যাংকটি নিট লোকসানে পড়েছে।

তৃতীয় প্রজন্মের কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফাও উল্লেখযোগ্য। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের সমন্বিত পরিচালন মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ২২৬ কোটি ৩ লাখ টাকা। ব্যাংক এশিয়ার ১ হাজার ২৬ কোটি ৩৪ লাখ এবং যমুনা ব্যাংকের ৯০৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

পরিচালন মুনাফা থেকে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন, কর ও অন্যান্য সমন্বয়ের পর নিট মুনাফা নির্ধারিত হয়। ফলে পরিচালন মুনাফা বেশি হলেও প্রভিশনের চাপ বাড়লে নিট মুনাফা কমে যেতে পারে। এমনকি লোকসানও হতে পারে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের আর্থিক ফলাফলে এর প্রতিফলন দেখা গেছে।

তৃতীয় প্রজন্মের ১৩টি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তাদের স্বতন্ত্র ফলাফল এ হিসাবে রাখা হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের প্রথম ৯ মাসের আর্থিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে এ প্রজন্মের ১০টি ব্যাংকের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

মুনাফায় বড় ভূমিকা সরকারি সিকিউরিটিজের 
ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মুনাফা অর্জনের ক্ষেত্রে ঋণের সুদ আয়ের পাশাপাশি সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড ও অন্যান্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সিটি ব্যাংক, ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় উল্লেখযোগ্য।

অন্যদিকে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ নিট মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রথম প্রজন্মের পাঁচ ব্যাংকের বড় অঙ্কের লোকসানও প্রজন্মভিত্তিক আর্থিক ফলাফলে স্পষ্ট ব্যবধান তৈরি করেছে।

তবে কোনো ব্যাংকের মুনাফা বেশি হলেই তার সামগ্রিক আর্থিক স্বাস্থ্য ভালো, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নে খেলাপি ঋণের হার, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য পরিস্থিতি এবং আয়ের স্থায়িত্বও বিবেচনায় নিতে হয়।