Print Date & Time : 04 November 2026 Wednesday 03:27 pm

কর্মক্ষম জনসংখ্যা কমছে, বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী

image

জাতীয় অর্থনীতি অনলাইন: দক্ষিণ এশিয়ার ১১৭ কোটি কর্মক্ষম জনসংখ্যাকে কাজে লাগানোর একটি সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সুযোগটি ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। এ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে পারছে না বাংলাদেশ। কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, নারীর কম অংশগ্রহণ ও দক্ষতার ঘাটতিতে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগছে না। অন্যদিকে প্রবীণ জনগোষ্ঠী দ্রুত বাড়ছে। ২০৪৫ সালে দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর কমতে শুরু করবে। ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ প্রবীণপ্রধান দেশে পরিণত হবে।

বিশ্বব্যাংকের নতুন প্রতিবেদন ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেইলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত ২০৪৫ সাল পর্যন্ত বাড়বে। দক্ষিণ এশিয়ার গড় সময়ের তুলনায় এটি প্রায় এক দশক বেশি সুযোগ তৈরি করেছে। এই সময়ের মধ্যে কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা সম্ভব। কিন্তু প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে জনসংখ্যার এ সুবিধা কাজে লাগানো যাবে না।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ নির্ভর করছে এখন দেশ কী পদক্ষেপ নিচ্ছে তার ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা, তরুণদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বাধা দূর করতে হবে। একই সঙ্গে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও বার্ধক্যকালীন আয়নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। এ জন্য অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধীরগতি
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের দুর্বল চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। দেশে কর্মরত মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। এসব কর্মসংস্থানে চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও অবসরকালীন সুবিধা সীমিত। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে ধীরগতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে কর্মী কমিয়েছে। উচ্চশিক্ষা থাকলেও আনুষ্ঠানিক চাকরি নিশ্চিত হচ্ছে না। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ কম এবং শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতিও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পথে বাধা হয়ে রয়েছে।

শিক্ষার দুর্বলতার চিত্রও উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ১০ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় ৫১ শতাংশ সহজ একটি লেখা পড়ে তার অর্থ বুঝতে পারে না। শিক্ষার এই ঘাটতি ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তির দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক জনসংখ্যার কাঠামো পরিবর্তনের ফলে মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বছরে গড়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট অবদান যুক্ত হয়েছে। তবে এই সুবিধা ধরে রাখতে হলে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিকল্প নেই।

২০৫১ সালে প্রবীণের হার দ্বিগুণ হবে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে বাংলাদেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত ৭ শতাংশে পৌঁছাবে। এর মধ্য দিয়ে দেশ প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির পর্যায়ে প্রবেশ করবে। ২০৫১ সালে এই হার দ্বিগুণ হয়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছাবে। তখন বাংলাদেশ বয়স্ক জনগোষ্ঠীনির্ভর সমাজে পরিণত হবে। উন্নত দেশগুলোর তুলনায় এই পরিবর্তন ঘটবে অনেক দ্রুত। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রবীণপ্রধান সমাজে রূপান্তর হতে সময় লেগেছে ৭২ বছর, ফ্রান্সের ১২৬ বছর। বাংলাদেশে এই পরিবর্তন ঘটবে মাত্র ২৪ বছরে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৮ সালের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে মাত্র ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বার্ধক্যের জন্য সঞ্চয় করেছেন বলে জানিয়েছেন। সামাজিক পেনশন কর্মসূচির আওতায় প্রবীণদের প্রায় অর্ধেক থাকলেও এই সুবিধা তাদের পর্যাপ্ত আর্থিক নিরাপত্তা দিতে পারছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়। দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে আসে। প্রবীণ বয়সে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন বাড়লে এই ব্যয় তাদের সঞ্চয় দ্রুত শেষ করে দিতে পারে।

প্রবীণ জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক অর্থনীতি
জনসংখ্যার বয়স কাঠামো বদলে যাওয়ার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণ পরিচর্যা ও সংশ্লিষ্ট সেবার চাহিদা বাড়বে। অর্থনীতিতে এই নতুন চাহিদাভিত্তিক বাজারকে বলা হচ্ছে সিলভার ইকোনমি বা প্রবীণ জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক অর্থনীতি। এতে নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে স্বাস্থ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়লেও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার গড় আয়ুর সঙ্গে এর ব্যবধান প্রায় ১০ বছর। অর্থাৎ জীবনের শেষ পর্যায়ে অনেক মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে নানা রোগ ও শারীরিক সীমাবদ্ধতায় ভোগেন। ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হারও প্রায় ১ শতাংশে নেমে আসে। এ পরিস্থিতিতে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও প্রবীণ পরিচর্যার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো উন্নয়নের তুলনামূলক আগের পর্যায়েই দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তাই এখনই বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণ শ্রমশক্তির সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। সুস্থ প্রবীণরা অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন। একে প্রতিবেদনে ‘সেকেন্ড ডিভিডেন্ড’ বা দ্বিতীয় জনমিতিক সুবিধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এ অঞ্চলের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন ব্যবস্থায় চাঁদা দেন। প্রবীণদের মধ্যে পেনশন সুবিধা পান মাত্র ১০ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বনিম্ন।

২০০০ সাল থেকে কর্মক্ষম বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের অনুপাত বাড়ায় দক্ষিণ এশিয়ার বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে গড়ে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশীয় পয়েন্ট এবং শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট অবদান এসেছে। তবে ২০৫০ সাল নাগাদ জনসংখ্যার কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বার্ষিক অবদান কমে মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্টে দাঁড়াতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানো এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রস্তুতি দুই ধরনের নীতিগত পদক্ষেপ একসঙ্গে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানো, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং শ্রমশক্তির চলাচল সহজ করা। পাশাপাশি পেনশন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, শৈশবের পুষ্টি ও বিকাশে বিনিয়োগ এবং সরকারি রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনের এক প্যানেল আলোচনায় পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, উদ্ভূত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের হাতে সময় সীমিত। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানকে আলাদা খাত হিসেবে না দেখে পরস্পর সম্পর্কিত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, দেশের ৫১ শতাংশ পরিবারের অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত। দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য পরিকল্পনায় মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। কারণ চিকিৎসা ব্যয় এখন পরিবারের জন্য নিয়মিত উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ভবিষ্যতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীনির্ভর সমাজের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে। তিনি কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, পর্যাপ্ত পরিচর্যা সুবিধার অভাব এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজের চাহিদার অসামঞ্জস্যকে কর্মসংস্থানের বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিশেষ করে নারী ও তরুণরা এসব সমস্যায় বেশি ভুগছেন।

বিশ্বব্যাংকের আঞ্চলিক প্র্যাকটিস ডিরেক্টর সেম মেতে বলেন, অনেক দেশের তুলনায় সামাজিক সুরক্ষা ও পেনশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশের হাতে সময় কম। এসব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ মানুষের বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগে সঞ্চয় ও পেনশন তহবিলে অবদান রাখার জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করতে হবে। 

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, জনমিতিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত মানুষের জীবনচক্রকে বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত নীতিকৌশল গ্রহণ করছে সরকার। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য তরুণদের প্রস্তুত করতে মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিনিয়োগনির্ভর কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, জনমিতিক পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন, স্বচ্ছতা এবং লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষাকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

—জা. অর্থনীতি/এএইচএ