Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 07:21 pm

কংগ্রেসের দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটদের জয়

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রতিনিধি পরিষদের (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে দলটি। এর আগে সিনেটের নিয়ন্ত্রণও নিশ্চিত হয়েছিল। এতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টি বড় ধাক্কা খেয়েছে।

এনবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪৩৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে নিয়ন্ত্রণ পেতে কমপক্ষে ২১৮টি আসন প্রয়োজন। ইতোমধ্যে ২২০টি আসনে জিতেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। মার্কিন নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, দলটি অন্তত ২৫৫টি আসন পেতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে তাদের মাত্র তিনটি বাড়তি আসন দরকার ছিল।

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, এই পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধের কিছুটা ভূমিকা আছে। তবে তার দাবি, ইরানে তিনি যা করেছেন, তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ভোটাররা সেটিও বুঝেছেন। তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাটরা এমন সব আইনের প্রস্তাব পাঠাবে, যা তার ভাষায় ‘পাগলামি’। সেগুলোতে তিনি ভেটো দেবেন। কয়েক মাস পর ডেমোক্র্যাটরাই ফোন করে কাজ সম্পন্নের উপায় জানতে চাইবে। তখন তারা একসঙ্গে কাজ করবেন।

এদিকে গত মঙ্গলবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যে লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল, এরই মধ্যে তা অর্জন করা হয়েছে। তাই এখন আর হামলা চালানোর পরিকল্পনা নেই।’ ছয় মিনিটের ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, আমরা যা চেয়েছি তার সবই পেয়েছি।’

ট্রাম্পের এ বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন ইরানে আবার হামলা চালানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। গত কয়েক সপ্তাহে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে। তবে নির্বাচনের আগের দিন ওয়াশিংটনে সাংবাদিকেরা তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি ‘না’ বলেছিলেন। একই দিন তিনি বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা হতে পারে।’

নির্বাচনের রাতে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, তিনি ব্যালটে ছিলেন না। থাকলে বিশাল ব্যবধানে জেতা যেত বলেও দাবি করেন তিনি। অথচ প্রচারে দুই ডজনের বেশি জনসভায় তিনি সমর্থকদের বলেছিলেন, ব্যালটে যেন তার নামও আছে বলে ধরে নেওয়া হয়। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার সিনেটের ১০০ আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হয়েছে। বেসরকারি ফলাফলে ১৫টিতে জিতেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। এতে সিনেটে দলটির আসন দাঁড়িয়েছে ৫২টিতে। নিয়ন্ত্রণের জন্য দরকার ৫১টি। আরও তিনটি আসনে এগিয়ে আছেন তারা।

সবচেয়ে বড় চমক দেখা গেছে সাউথ ক্যারোলিনায়। রাজ্যটি ১৯৯৮ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত করেনি। ২০২৪ সালে ট্রাম্প সেখানে প্রায় ১৮ পয়েন্টের ব্যবধানে জিতেছিলেন। এবার শিশু বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুস রিপাবলিকান সিনেটর ডারলিন গ্রাহামকে হারিয়েছেন। প্রয়াত সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন ডারলিন ভাইয়ের মৃত্যুর পর আসনটিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন। ট্রাম্প নিজে তাকে সমর্থন দেন।

টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো ট্রাম্প-সমর্থিত অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে হারিয়েছেন। ১৯৮৮ সালের পর এই প্রথম আসনটি পেল ডেমোক্র্যাটরা। প্যাক্সটনকে এগিয়ে দিতে ট্রাম্প দলের নিরাপদ প্রার্থী হিসেবে পরিচিত সিনেটর জন করনিনকে পাশ কাটিয়েছিলেন। প্যাক্সটন ২০২৩ সালে অভিশংসনের মুখে পড়েছিলেন। সিকিউরিটিজ জালিয়াতির অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ছিল।

নর্থ ক্যারোলিনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে হারিয়েছেন। ওহাইওতে শেরড ব্রাউন জিতেছেন দুই বছর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের দখলে থাকা আসনটি। কানসাসে খ্রিষ্টান ধর্মযাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন জিতেছেন। মহামন্দার পর এমন ঘটনা এই প্রথম। মিশিগানে ডেমোক্র্যাট আব্দুল এল-সায়েদ রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে হারিয়ে প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন।

প্রতিনিধি পরিষদে পেনসিলভানিয়ায় রিপাবলিকানদের চার বর্তমান প্রতিনিধি হেরেছেন। তাদের মধ্যে আছেন ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক এবং ‘ফ্রিডম ককাস’-এর সাবেক চেয়ারম্যান স্কট পেরি। ভার্জিনিয়ায় হেরেছেন রব উইটম্যান। নিউ জার্সিতে টম কিন জুনিয়র হেরেছেন রেবেকা বেনেটের কাছে। ইন্ডিয়ানায় পরাজিত হয়েছেন ভিক্টোরিয়া স্পার্টজ। নর্থ ক্যারোলিনায় হাউজ রিপাবলিকানদের নির্বাচনি প্রচার শাখার প্রধান রিচার্ড হাডসনকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট রিচার্ড ওজেদা জুনিয়র।

রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপ অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলার পরের সময়ের চেয়েও নিচে নেমেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ফল ট্রাম্পের অজনপ্রিয় নীতির বিরুদ্ধে গণভোটের মতো। এর মধ্যে আছে অভিবাসনবিরোধী কঠোর অভিযান, মিত্রদের ওপর শুল্ক এবং ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ। এসবের কারণে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে।

রিপাবলিকান কৌশলবিদ ডৌ হাই একে ‘ট্রাম্প-কম্পন’ বলেছেন। তার মতে, ট্রাম্প ভোটারদের শুধু নিজের কাছে কী গুরুত্বপূর্ণ, তা-ই বুঝিয়েছেন। হোয়াইট হাউজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ছয় সপ্তাহ আগেই প্রশাসনের জরিপে দুই কক্ষ হারানোর আভাস মিলেছিল। তখন ট্রাম্প মাসব্যাপী সারা দেশে প্রচারে নামেন। আগামী ৩ জানুয়ারি ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেবে। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথমবারের মতো ট্রাম্প এমন কংগ্রেসের মুখোমুখি হবেন, যার ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।