Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 08:58 pm

জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে এখনই উদ্যোগ নিন

image

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তরুণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। অর্থনীতির জন্য এটি এক বিরাট সম্ভাবনা। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর মতো কর্মসংস্থান, দক্ষ জনশক্তি, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে যে জনমিতিক সুবিধা দেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তি হওয়ার কথা, তা ক্রমেই বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা যায়, দেশের স্নাতক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত মানুষের ৬০ শতাংশের বেশি যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে তাদের অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করতে হচ্ছে। এসব কাজে তাদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা অর্জন করেও একটি বড় জনগোষ্ঠী নিজেদের যোগ্যতা ও শ্রমের যথাযথ মূল্য পাচ্ছে না।

দেশের কর্মক্ষম মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। সংখ্যায় যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। অথচ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে সাধারণত চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত আয়, সামাজিক সুরক্ষা ও অবসরকালীন সুবিধা থাকে না। এমনকি মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানেও মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক। এর অর্থ, দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান থাকলেও তার বড় অংশই অনিরাপদ ও নিম্নমানের।


কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতাও স্পষ্ট। বাংলাদেশে এসব প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। বিকল্প চাকরি না পেয়ে অনেক মানুষ ক্ষুদ্র উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন। উদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক হলেও যখন তা পছন্দের পরিবর্তে বাধ্যবাধকতায় পরিণত হওয়ায় এটি অর্থনীতির দুর্বলতাই প্রকাশ করে।

বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম-উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার কম। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন কর্মী নিয়োগের পরিবর্তে কর্মীসংখ্যা কমাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যবসার পরিবেশের উন্নয়ন এবং দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। শুধু শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কমানো নয়, তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করাই হওয়া উচিত কর্মসংস্থান নীতির লক্ষ্য।

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাজ তৈরি না হলে এই জনশক্তি অর্থনীতির সম্পদ না হয়ে বোঝায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। অন্যদিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমে গেলে সীমিতসংখ্যক কর্মজীবী মানুষের ওপর নির্ভরশীল বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়বে। তখন পেনশন, চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যয় সামলানো আরও কঠিন হবে।

এই ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্তমান শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা অপরিহার্য। এখন প্রয়োজন জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক পরিবর্তনকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা। প্রাথমিক ও প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়ন, কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ, নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নতুন শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, দক্ষ উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার পরিবেশও তৈরি করা প্রয়োজন।

একইসঙ্গে ভবিষ্যতের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য এখন থেকেই সামাজিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রস্তুত করতে হবে। অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও বার্ধক্যকালীন আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে জাতীয় পরিকল্পনায় যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বড় অঙ্কের বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি সঠিক ব্যক্তি যেন সঠিক সময়ে কার্যকর সহায়তা পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।


জনমিতিক সুবিধা কোনো দেশের জন্য চিরস্থায়ী নয়। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ, সুস্থ ও উৎপাদনশীল করে তুলতে না পারলে সেই সুযোগ এক সময় সংকুচিত হয়ে যায়। বাংলাদেশের সামনে সেই সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে। তাই এখন আর শুধু জনমিতিক লভ্যাংশ নিয়ে আলোচনা নয়, বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। ধনী হওয়ার আগেই বুড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে হলে আজই কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় কার্যকর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আগামী দুই দশকের সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ জনমিতিক সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে পারবে, নাকি অপূর্ণ সম্ভাবনার ভার নিয়ে বার্ধক্যের দিকে এগোবে।