Print Date & Time : 03 November 2026 Tuesday 11:53 pm

তুরাগের দূষণ ঠেকাতে ১৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প, কেনা হবে ড্রোন (ভিডিও)

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একটি নদীকে বাঁচাতে এবার আকাশে উড়বে ড্রোন! তুরাগ নদের দূষণ পর্যবেক্ষণ, শিল্পকারখানার বর্জ্য নির্গমনের উৎস শনাক্ত এবং দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রায় ১৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এত টাকা খরচের পর সত্যিই কি দূষণমুক্ত হবে তুরাগ?

অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপে দীর্ঘদিন ধরেই দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত রাজধানীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তুরাগ নদ। নদটির তীরবর্তী ১৭৩টি শিল্পকারখানার বর্জ্য দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ড্রোন কেনার পাশাপাশি স্থাপন করা হবে সার্বক্ষণিক অনলাইন পর্যবেক্ষণকেন্দ্র।

 

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৮৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে আসবে ১৮৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন মাত্র ১০ লাখ টাকা। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। বুধবার একনেক সভায় অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয়ের খাত ১৭৩টি শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপির কার্যকারিতা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৪৭ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিটি কারখানার ইটিপি পর্যবেক্ষণে গড়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮২ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।

এ ছাড়া ড্রোন কেনায় ব্যয় হবে ১ কোটি টাকা। ছয়টি সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। তুরাগ নদের তলদেশ পরিষ্কারে ব্যয় ধরা হয়েছে আরও ২ কোটি টাকা।

শুধু নজরদারিই নয়, দূষণকারীদের বিরুদ্ধে অভিযানও চালানো হবে। প্রকল্পের আওতায় দূষণের অভিযোগ ও ঝুঁকির ভিত্তিতে অন্তত ১০০টি পরিদর্শন ও অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। ড্রোনের মাধ্যমে বর্জ্য ফেলার স্থান শনাক্ত, দূষণের হটস্পট চিহ্নিত করতে মানচিত্র তৈরি এবং নৌযানের মাধ্যমে টহল দেওয়া হবে।

নদের পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণে স্থাপন করা হবে অনলাইনভিত্তিক তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। অন্তত ৩৬ বার পানির নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হবে। পাশাপাশি জিআইএস প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বিত নজরদারি এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ৩৩৩-৪ হটলাইনকে আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নোটিশ ও জরিমানার ব্যবস্থাও থাকবে।

সরকারের একটি সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদে বর্জ্য নির্গমনের ২২৪টি উৎস শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে তুরাগে ৫৮টি এবং বুড়িগঙ্গায় ১৬৬টি। দুই নদীর সম্মিলিত দূষণের ৫৫ শতাংশের জন্য দায়ী শিল্পবর্জ্য।

তবে প্রকল্পের বিপুল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিবেশকর্মীরা। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবিরের প্রশ্ন, দূষণকারী কারখানার মালিকদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় এবং তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে কি না।

তার মতে, নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি দূষণের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি।

সবশেষে প্রশ্ন একটাই-১৮৪ কোটি টাকার এই প্রকল্প কি তুরাগকে সত্যিই বাঁচাতে পারবে, নাকি নজরদারি আর যন্ত্রপাতি কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে উদ্যোগ?

কারণ ড্রোন উড়লেই নদী দূষণমুক্ত হবে না। দূষণকারী কারখানার বর্জ্য নির্গমন বন্ধ এবং নদীর পানির গুণগত মানের দৃশ্যমান উন্নতিই হবে এই প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি