নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা এবং গাজীপুর, সাভার ও নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি: ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনে টানা চতুর্থ দিনের মতো উত্তাল রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর, সাভারসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চল। গতকাল সোমবার দিনভর শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় স্থবির হয়ে পড়েছে তৈরি পোশাকশিল্পের উৎপাদন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন মালিকেরা।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত তাদের সদস্য ৬৭০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এসব কারখানায় কর্মরত ১৬ লাখ ৮০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ না করেই বাড়ি ফিরে গেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) হিসাবে নারায়ণগঞ্জে আরও প্রায় ২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। দুই সংগঠনের তথ্য মিলিয়ে বন্ধ কারখানার সংখ্যা প্রায় ৬৯০।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রধান দাবি হচ্ছে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা। এর পাশাপাশি ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগ, বিনা কারণে ছাঁটাই বন্ধ, রেশনিং ব্যবস্থা চালু এবং আন্দোলনকারী শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত না করার দাবিও রয়েছে। সরকার নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করলেও শ্রমিকদের অসন্তোষ পুরোপুরি কাটেনি। ফলে গতকাল সোমবার দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চলে বেশকিছু সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে।
গাজীপুরে গতকাল সকাল থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর ও মৌচাক এবং কোনাবাড়ী, নাওজোর ও ভোগড়া বাইপাস এলাকায় বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকেরা। একপর্যায়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন তারা। কোথাও কাঠ, বাঁশ ও টায়ার জ্বালিয়ে সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। এতে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয় এবং ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। নাওজোর এলাকায় বিক্ষোভের মধ্যে পুলিশের একাধিক গাড়ি ভাঙচুর এবং একটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সফিপুর ও চন্দ্রা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শ্রমিকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার সময় ইটের আঘাতে এক বিজিবি সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গাজীপুরে তিনটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে এবং অন্তত ৩০ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের হিসাবে আন্দোলন ঘিরে ৩৯ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও পাওয়া গেছে।
ওই এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় টিভির প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলা চালানো হয়। তাদের ক্যামেরা ভাঙচুরসহ একাধিক সাংবাদিককে মারধর ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলন ঘিরে পুলিশের গাড়ি, কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এর আগে চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গুদাম ও একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়।
শ্রমিক অসন্তোষের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে গতকাল গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে দেড় শতাধিক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার তথ্য পাওয়া যায়। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, শ্রমিকদের বিক্ষোভের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে দেড় শতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিজিবি, জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও শিল্প পুলিশ একযোগে কাজ করছে।
এদিকে রাজধানী মিরপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও টিয়ার শেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর মিরপুর-১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর এলাকায় সকাল থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-১৪ নম্বর থেকে মিছিল নিয়ে মিরপুর-১০ গোলচত্বরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন শ্রমিকেরা। পুলিশ বাধা দিলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। একপর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। আগের দিন মিরপুরে সংঘর্ষের সময় পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং ট্রাফিক বক্স ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় চারটি মামলা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলাগুলোতে ৩১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মিরপুর-২ নম্বরের বড়বাগ এলাকায় সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড ও দেশওয়ান অ্যাপারেলস নামে দুটি পোশাক কারখানায় এদিন হামলা ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। কারখানা দুটির কর্মকর্তারা জানান, হামলার সময় শ্রমিকেরা কাজে নিয়োজিত ছিলেন। পরে আন্দোলনকারীরা কারখানার সামনে জড়ো হয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে কারখানার কাচ, অভ্যর্থনা কক্ষের সরঞ্জাম, সিসিটিভি মনিটর ও ডিজিটাল হাজিরা যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এদিকে সাভারের আশুলিয়ার নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় সকাল থেকে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। নরসিংহপুর এলাকায় একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। পরে স্থানীয় লোকজন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। উলাইল ও হেমায়েতপুরের পদ্মার মোড় এলাকাতেও শ্রমিকদের জড়ো হওয়ার চেষ্টা ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়। নিরাপত্তার স্বার্থে আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আশুলিয়ার ২৬৪টি কারখানায় সোমবার সাধারণ ছুটি বা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে ফতুল্লার কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকা থেকে মিছিল নিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কে অবস্থান নেন শ্রমিকেরা। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে শুরু হওয়া অবরোধে শিবু মার্কেট থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। মেট্রো নিটিং, পলমল গার্মেন্টস, আবির ফ্যাশন ও আজাদ-রিফাত ডাইংসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা এতে অংশ নেন।
এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্পের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। বোর্ডে মালিক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি নিরপেক্ষ সদস্য রয়েছেন। বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, সরকার পোশাক শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। দাবি পূরণ হওয়ায় শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি সদস্য বাবুল আখতার বলেন, ‘শ্রমিক ভাইদেরকে অনুরোধ করছি, আপনারা কাজে ফিরে যান এবং আপনারা আপনাদের নিয়মিত কাজে যোগ দেন। অন্য কারও উস্কানিতে, অন্য কারও ধরনের প্ররোচনায় পা দিয়ে আপনাদের শিল্পকারখানা ধ্বংস আপনারা করবেন না।’তিনি আরও বলেন, এই শিল্প শ্রমিক, সরকার ও মালিক—সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে দাবির বিষয়ে আলোচনা হবে। একই সঙ্গে শ্রমিক আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তৈরি পোশাকশিল্পের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। শ্রমিকদের বর্তমান আন্দোলনের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে অসন্তোষ অব্যাহত রয়েছে। ফলে দেশের প্রধান পোশাক শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক করা এবং শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে সমাধানে পৌঁছানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।