Print Date & Time : 03 November 2026 Tuesday 05:58 pm

নয় মাসে ইসলামী ব্যাংকের ৩,২৮৬ কোটি টাকা লোকসান

image

জাতীয় অর্থনীতি, ঢাকা: চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকার বেশি লোকসান করেছে। কমেছে ব্যাংকটির আমানতের পরিমাণও। বিপরীতে বেড়েছে খেলাপি ঋণ।

ব্যাংকটির চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টম্বর) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

ব্যাংকটির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ২০ টাকা ৪১ পয়সা। আগের বছরের একই সময়ে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ৬২ পয়সা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটি মুনাফা থেকে বড় অঙ্কের লোকসানে পড়েছে। শুধু জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকেই শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১২ টাকা ২৪ পয়সা। আগের দুই প্রান্তিকেও লোকসান ছিল। ফলে ধারাবাহিকভাবে খারাপ হয়েছে ব্যাংকটির আয়-ব্যয়ের চিত্র।

ব্যাংকটির এই আর্থিক সংকটের পেছনে খেলাপি বিনিয়োগ থেকে আয় না পাওয়া, আমানতের বিপরীতে মুনাফা ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বিনিয়োগের অর্থ আটকে থাকার মতো বিষয় রয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালনায় দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্বসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

গত ১৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে পর্ষদের দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়া হয়। সেই থেকে কার্যত একজনের মাধ্যমে পর্ষদের দায়িত্ব পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে, গত এপ্রিল থেকে ব্যাংকটিতে নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নেই। তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ওমর ফারুক খানকে ছুটিতে পাঠানোর পর অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।

ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন, ঋণসীমা বাড়ানো, ঋণ নবায়ন এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে বিলম্ব হচ্ছে। এতে দীর্ঘদিনের করপোরেট গ্রাহকরাও প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সেবা পেতে সমস্যায় পড়ছেন। বিশেষ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও তৈরি পোশাক খাতের যেসব প্রতিষ্ঠান বেতন-ভাতা পরিশোধ, কাঁচামাল আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে ব্যাংকটির ওপর নির্ভরশীল, তাদের ব্যবসায় অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

ব্যাংকটির আমানতেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে ব্যাংকটির আমানত ছিল প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। তা কমে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে আমানত কমেছে প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা। আমানত কমে যাওয়ার পাশাপাশি খেলাপি ঋণের বোঝাও বেড়েছে। গত জুন শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।

ব্যাংকটির সংকটের আরেকটি বড় দিক হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও জবাবদিহির কাঠামোর দুর্বলতা। পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকায় ঋণ অনুমোদনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা, যাচাই-বাছাই ও সমন্বিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সীমিত হচ্ছে। একজনের পক্ষে একই সঙ্গে ব্যাংকের নিয়মিত কার্যক্রম, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব পালন কঠিন। ফলে দৈনন্দিন লেনদেন সচল থাকলেও ব্যাংকের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিশ্চিত হচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকটির সংকটকে শুধু তারল্য বা খেলাপি ঋণের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে সুশাসন, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের ঘাটতি জড়িত। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও খেলাপি বিনিয়োগের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে হলে ঋণ আদায়ের পাশাপাশি ব্যাংকের পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত যোগ্য ও স্বাধীন পরিচালকদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ গঠন এবং নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ না হলে ব্যাংকটির ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার কঠিন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংকের জন্য যোগ্য ও স্বচ্ছ পর্ষদ গঠনে যাচাই-বাছাই চলছে। তবে কবে নাগাদ পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ ও নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ব্যাংকটির আর্থিক অবনতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে পুঁজিবাজারেও। গত সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যাংকটির শেয়ারের দাম ১৯ টাকা ৫০ পয়সায় নেমে আসে, যা ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে ব্যাংকটির নিট সম্পদমূল্যও কমেছে। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির একক ভিত্তিতে নিট সম্পদমূল্য দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৬ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা।

—জা.অর্থনীতি/আরএস