Print Date & Time : 03 November 2026 Tuesday 02:30 am

লোকসানে ডুবছে প্রথম প্রজন্মের ৫ ব্যাংক

image

সাইদুর রহমান নোমান, ঢাকা: দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) এই প্রজন্মের পাঁচ ব্যাংক সম্মিলিতভাবে প্রায় ১১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা নিট লোকসান করেছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এবি ব্যাংক ও আইএফআইসি ব্যাংকের লোকসানই ১১ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। বিপরীতে একই প্রজন্মের অন্য চার ব্যাংক সম্মিলিতভাবে প্রায় ২ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা মুনাফা করেছে।


লোকসানি ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিপুল খেলাপি ঋণ, ঋণ ও বিনিয়োগ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং আমানতের বিপরীতে সুদ ও মুনাফা ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তাদের আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। ঋণ আদায় না হওয়ায় কয়েকটি ব্যাংক খেলাপি ঋণের সুদ আয় হিসেবে দেখাতে পারছে না। অথচ আমানতকারীদের সুদ ও মুনাফা পরিশোধ করতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর নিট সুদ আয় ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণের চাপ, তারল্যসংকট ও মূলধন ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

অন্যদিকে মুনাফায় থাকা ব্যাংকগুলো ঋণ ও বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড, কমিশন এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন থেকে আয় করেছে। ফলে একই সময়ে একদল ব্যাংক বড় অঙ্কের লোকসানে পড়লেও অন্যগুলো মুনাফা ধরে রাখতে পেরেছে।

ইসলামী ব্যাংকের লোকসান সর্বোচ্চ
প্রথম ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটি প্রায় ৭৯ কোটি টাকা মুনাফা করেছিল।

ব্যাংকটির আর্থিক সংকটের অন্যতম কারণ ঋণ ও বিনিয়োগের অর্থ আদায় করতে না পারা। ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন নামে ব্যাংকটি থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ বের করে নেওয়ার তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে। এসব অর্থের বড় অংশ খেলাপি হয়ে পড়ায় বিনিয়োগ থেকে আয় কমেছে। অন্যদিকে আমানতকারীদের মুনাফা পরিশোধের ব্যয় বেড়েছে। এতে আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।

চলতি বছর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ঘিরেও অস্থিরতা দেখা দেয়। গ্রাহকদের বিক্ষোভের পাশাপাশি আমানত তুলে নেওয়ার চাপ তৈরি হয়। পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্তির চার মাসের বেশি সময় পার হলেও নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ করা প্রশাসকের মাধ্যমে ব্যাংকটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের সুদ ব্যয় আয়ের প্রায় আট গুণ
লোকসানের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ১৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। একই সময়ে পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪১৭ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় সংকট সুদ আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বিপুল ব্যবধান। প্রথম ৯ মাসে সুদ বাবদ আয় হয়েছে মাত্র ৪৪৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। বিপরীতে আমানত ও ঋণের সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫২৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ সুদ আয়ের প্রায় আট গুণ ব্যয় হয়েছে। এতে নিট সুদ ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এ সময়ে পরিচালন ব্যয় ছিল ৫৭৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা।

ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ঋণাত্মক ৯ টাকা ৩৭ পয়সা। শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) একক ভিত্তিতে ঋণাত্মক ১৬ টাকা ৮১ পয়সা এবং সমন্বিত ভিত্তিতে ঋণাত্মক ১৬ টাকা ৭৭ পয়সা। সমন্বিত শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ঋণাত্মক ৫ হাজার ৪১২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

এবি ব্যাংকের লোকসান ২,৮১৭ কোটি টাকা
তৃতীয় সর্বোচ্চ লোকসান করেছে এবি ব্যাংক। প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত নিট লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৮১৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা। নিট সুদ ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৯১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ সুদ থেকে অর্জিত আয় দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যয় মেটাতে পারছে না ব্যাংকটি।

এ সময়ে এবি ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৫০৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক ৩১ টাকা ৪৬ পয়সা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক ৬৪ টাকা ১৮ পয়সা। ব্যাংকটির সমন্বিত শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ঋণাত্মক ৬ হাজার ৬৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

আইএফআইসি ব্যাংকের লোকসান ২,৫০৭ কোটি টাকা
প্রথম ৯ মাসে আইএফআইসি ব্যাংকের সমন্বিত নিট লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৫০৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ব্যাংকটির নিট সুদ ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। একই সময়ে পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৯০২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

ব্যাংকটির সমন্বিত শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক ১৩ টাকা ৪ পয়সা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক ৮ টাকা ৫ পয়সা। সমন্বিত শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ঋণাত্মক ১ হাজার ৫৪৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা।

আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাও নাজুক
তুলনামূলক কম লোকসান করলেও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকের আর্থিক অবস্থাও নাজুক। প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ৭০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। পরিচালন লোকসান দাঁড়িয়েছে ৭০ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

এ সময়ে ব্যাংকটির বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বিপরীতে আমানতের মুনাফা বাবদ ব্যয় হয়েছে ৫২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ফলে নিট বিনিয়োগ ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৪৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। পরিচালন ব্যয় হয়েছে ৩২ কোটি ৬২ লাখ টাকা।

ব্যাংকটির শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক ১ টাকা ৭ পয়সা এবং শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক ২৩ টাকা ৭ পয়সা। মোট শেয়ারহোল্ডার ইকুইটি ঋণাত্মক ১ হাজার ৫৩৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ব্যাংকটির আমানত রয়েছে ১ হাজার ৯৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং বিনিয়োগের পরিমাণ ৬২২ কোটি ১২ লাখ টাকা।

মুনাফায় পূবালী, সিটি, উত্তরা ও ইউসিবি
প্রথম প্রজন্মের পাঁচ ব্যাংক লোকসান করলেও অন্য চার ব্যাংক মুনাফা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে পূবালী ব্যাংক। প্রথম ৯ মাসে ব্যাংকটির সমন্বিত কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৫৮৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এছাড়া সিটি ব্যাংক ৮৬৭ কোটি টাকা, উত্তরা ব্যাংক ৪৩০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ৪১ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে।

মুনাফা করা ব্যাংকগুলোর আয়ের বড় উৎস ছিল সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড, ঋণ ও বিনিয়োগ, কমিশন, ব্রোকারেজ এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন।

প্রথম ৯ মাসে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ড থেকে সিটি ব্যাংকের আয় হয়েছে ৩ হাজার ২ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় বেড়েছে ২২৭ কোটি টাকা। একই সময়ে ঋণের সুদ আয় বেড়েছে ২২৯ কোটি টাকা। বিপরীতে আমানতের সুদ ব্যয় বেড়েছে ৭৪ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকটির নিট সুদ আয় বেড়ে ৩২৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

পূবালী ব্যাংকের মুনাফায় বড় অবদান রেখেছে কমিশন, বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় ও ব্রোকারেজ খাত। প্রথম ৯ মাসে এসব খাত থেকে ব্যাংকটির আয় হয়েছে ৪ হাজার ২০৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। পাশাপাশি সরকারি সিকিউরিটিজ ও অন্যান্য বিনিয়োগ থেকেও আয় বেড়েছে।

উত্তরা ব্যাংকের মুনাফায় ভূমিকা রেখেছে সরকারি সিকিউরিটিজ, বিনিয়োগ, কমিশন ও ব্রোকারেজ খাতের আয়। এছাড়া আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ৬৮ কোটি ৭৮ লাখ টাকা কমেছে। এটিও ব্যাংকটির মুনাফায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

দেশের প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ন্যাশনাল ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইউসিবি, উত্তরা ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এসব ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকাল, মালিকানার ইতিহাস ও শ্রেণিবিন্যাস এক নয়। ফলে তাদের আর্থিক ফলাফল তুলনার ক্ষেত্রে এই পার্থক্য বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।