Print Date & Time : 05 November 2026 Thursday 01:22 am

ছয় ঘণ্টা পর সড়ক-রেলপথ ছাড়লেন শিক্ষার্থীরা

image

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সড়ক দুর্ঘটনায় আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের (আইআইইউসি) শিক্ষার্থী মাইশা মুশফিরাতের মৃত্যুর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের প্রায় ছয় ঘণ্টার অবরোধ শেষ হয়েছে। 

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ঘটনাস্থলে গিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো শুনে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, অবৈধ লরি পার্কিং বন্ধসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে অবরোধ তুলে নেন তাঁরা। এর আগে সকাল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এতে সড়কে দীর্ঘ যানজটের পাশাপাশি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগও ব্যাহত হয়।

মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। নিহত মাইশা মুশফিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় রাজিয়া নামে আরেক শিক্ষার্থী আহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাইশাসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। এ সময় তাঁদের সামনে একটি বাস থামলে পেছন দিক থেকে দ্রুতগতির একটি লরি বাসটিকে ধাক্কা দেয়। এতে বাসটি উল্টে মাইশার ওপর পড়ে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একই সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথও অবরোধ করেন তাঁরা। এতে মহাসড়কের দুই পাশে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়। আটকা পড়ে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন। অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি যানবাহনও আটকে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল যোগাযোগ।

শিক্ষার্থীরা জানান, ক্যাম্পাসের সামনে এ ধরনের দুর্ঘটনা আগেও ঘটেছে। প্রতিবারই প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। ২০১৮ সালেও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন তাঁরা। এবার আর আশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা চান তাঁরা।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মামলা, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে লরিচালককে গ্রেপ্তার এবং চালক ও মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা, কেডিএস ডিপোর অবৈধ পার্কিং বন্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের দুই পাশে ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, নিহত শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ এবং নিরাপদে সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

শিক্ষার্থীরা জেলা প্রশাসকের সরাসরি উপস্থিতি এবং দাবিগুলো বাস্তবায়নের লিখিত আশ্বাস দাবি করেন। ইউএনও বা পুলিশের আশ্বাসে অবরোধ প্রত্যাহার করতে রাজি ছিলেন না তাঁরা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে ঘটনাস্থলে যান সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। পরে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ঘটনাস্থলে যান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম, আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ শিক্ষকেরা।

দুর্ঘটনার পর আহত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার বিষয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন জেলা প্রশাসক। নিহত মাইশার বাবা দিদারুল আলমের সঙ্গেও কথা বলে সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেন। পরে মহাসড়কে অনুষ্ঠিত মাইশার জানাজায় অংশ নেন জেলা প্রশাসকসহ উপস্থিত ব্যক্তিরা।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, তাঁদের দাবিগুলো শোনার আগেই তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন এলাকায় ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের জন্য ওই দিনই লিখিতভাবে জানাবেন, যাতে দ্রুত কাজ শুরু করা যায়।

অবৈধ লরি পার্কিং বন্ধের আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান রাস্তা দখল করে লরি বা গাড়ি রাখতে পারবে না। সড়কের দুই পাশে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেললাইনের পাশের অবৈধ স্থাপনাও উচ্ছেদ করা হবে।

দুর্ঘটনায় জড়িত লরিচালককে দ্রুত আইনের আওতায় আনার বিষয়ে পুলিশ সুপারের আশ্বাসের কথাও জানান জেলা প্রশাসক। নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী লরির মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আর্থিক সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকেও সহায়তা দেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক শিক্ষার্থীদের অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাঁদের দাবিগুলো স্বল্পতম সময়ের মধ্যে পূরণে প্রশাসন উদ্যোগ নেবে। তাঁর আশ্বাস এবং প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে অবরোধ প্রত্যাহার করেন শিক্ষার্থীরা।

—জা.অর্থনীতি/আরএস