সাইফুল আলম, চট্টগ্রাম: ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখে বাড়ি, জমি ও কারখানার যন্ত্রপাতি বিক্রি করে দিচ্ছে চট্টগ্রামের হাবিব গ্রুপ। এই শিল্পগোষ্ঠীর দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা ‘কিছু সম্পদ বিক্রির’ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, পাওনা পরিশোধ না করে এভাবে সম্পদ বিক্রি করায় তারা ঋণ আদায় নিয়ে বড় উদ্বেগে আছেন। এসব সম্পদ ব্যাংকের কাছে বন্ধক ছিল কি না বা বিক্রির টাকায় ঋণ শোধ হয়েছে কি না; তা জানা যায়নি।
রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান হাবিব জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, তারা কিছু প্রতিষ্ঠান চালুর চেষ্টা করেও সফল হননি। আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তবে সম্পদ বিক্রি ও সেই অর্থ বিদেশে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তার সরাসরি মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া
ব্যাংক ও হাবিব গ্রুপ সূত্রে জানা যায়, ১৯৪৭ সালে হাবিব উল্লাহ মিয়া পণ্য কেনাবেচার ব্যবসার মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু করেন। পরে তার তিন সন্তান ইয়াকুব আলী, মাহবুব আলী ও ইয়াসিন আলীর নেতৃত্বে সিমেন্ট, জাহাজভাঙা, বস্ত্র, বিদ্যুৎ, সার, কাগজ ও উড়োজাহাজ পরিবহন খাতে ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়। ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানেও অংশীদারিত্ব গড়ে তোলে পরিবারটি।
ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সূত্রে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট বকেয়া ঋণ প্রায় ৪ হাজার ৩৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেনা হাবিব স্টিলসের। প্রতিষ্ঠানটির কাছে ১৪টি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের পাওনা প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। রিজেন্ট এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের কাছে আট ব্যাংকের পাওনা ৪৪৪ কোটি টাকা।
এছাড়া ডায়মন্ড সিমেন্টের ৪০৯ কোটি, রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলসের ৩৫০ কোটি, লিগ্যাসি ফ্যাশনের ৩৩৪ কোটি, রিজেন্ট স্পিনিং মিলসের ৩০২ কোটি, হেলা ক্লদিংয়ের ২১০ কোটি, এএনজেড প্রপার্টিজের ১৫৮ কোটি, আনোয়ারা ফ্যাশনের ১৫৫ কোটি, রিজেন্ট উইভিংয়ের ১৫১ কোটি, সাইমেস সুপেরিয়রের ১৪৫ কোটি, রিজেন্ট ফেব্রিকের ১৩৫ কোটি ও এইচজি এভিয়েশনের ১১৩ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
চিটাগাং স্টিল এন্টারপ্রাইজের বকেয়া ৯১ কোটি টাকা। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমটিএস রি-রোলিং মিলসের ৬৬ কোটি, আনোয়ারা পেপার মিলসের ৩৪ কোটি, রিজেন্ট পাওয়ারের ২৯ কোটি, ভ্যালায়েন্ট ফ্যাশন, ওশেন মেরিট ও আলী ফ্যাশনের প্রতিটির ১৪ কোটি, ফরচুন নেভিগেশনের ১২ কোটি এবং সাউদার্ন মেডিকেল কলেজের আড়াই কোটি টাকা দেনা রয়েছে। তবে এই বকেয়ার কতটা খেলাপি ঋণ; তার পৃথক হিসাব পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বাইরেও হাবিব গ্রুপের কাছে বিভিন্ন পক্ষের পাওনা রয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পাওনা প্রায় ৩০০ কোটি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনাদায়ী পাওনা প্রায় ২০০ কোটি টাকা। নাহিদ কটন মিলসের পাওনা ১০ কোটি টাকা। এছাড়া উড়োজাহাজ পরিবহন ব্যবসার ২০ জন পাইলটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও গ্রুপটির কাছে টাকা পাবেন।
বাড়ি, জমি ও যন্ত্রপাতি বিক্রি
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০২১ সালের পর হাবিব শেয়ার অ্যান্ড সিকিউরিটিজ বিক্রি করা হয়। পরে গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ের পাশের ছয় কাঠা জমিও বিক্রি হয়। ব্যবসায়ী সেকান্দর হোসেন টিংকুর মালিকানাধীন কেআর গ্রুপের নামে জমিটি কেনা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। সেখানে এখন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের চকবাজারের জয়নগরে গ্রুপের দুটি বাড়িও বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন গ্রুপের এক কর্মকর্তা। তার সঙ্গে প্রতিবেদক পরিচয় গোপন করে যোগাযোগ করেন। বিভিন্ন সময়ে জমি ও কারখানার যন্ত্রপাতি বিক্রির কথাও স্বীকার করে তিনি বলেন, বাড়ি বিক্রির বিষয়টি তাদের একজন পরিচালক দেখভাল করেছেন। তার ভাষ্য, আবুল খায়ের গ্রুপের এক পরিচালক বাড়ি দুটি কিনেছেন। তবে কত টাকায় লেনদেন হয়েছে তা তিনি জানাননি। তার ভাষ্য, এখন কিছু কারখানার জমি ও ভবন আছে। যন্ত্রপাতি আগেই বিক্রি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আনোয়ারা পেপার মিলস ও পোশাক কারখানার যন্ত্রপাতি বিভিন্ন সময়ে বিক্রি হয়েছে। এসব বিক্রির কাজে গ্রুপের চেয়ারম্যান ইয়াকুব আলী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসিন আলীর ভাগনে ইফতেখার উদ্দিন এবং আত্মীয় নাসির উদ্দিন যুক্ত রয়েছেন বলে সূত্রগুলোর দাবি।
শাহজালাল ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, জাহাজভাঙা ও উড়োজাহাজ পরিবহন ব্যবসায় লোকসানের কথা জানিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ করছে না গ্রুপটি। উদ্যোক্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে থাকায় তারা উদ্বিগ্ন।
প্রতিষ্ঠান চালুর চেষ্টা করার দাবি
সাম্প্রতিক আলাপে রিজেন্ট টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালমান হাবিব বলেন, ‘আমরা কিছু প্রতিষ্ঠান চালু করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিনি। এর বেশি কিছু এখন বলার মতো অবস্থায় নেই। আমাদের আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়।’ এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। সম্পদ বিক্রির অর্থ কীভাবে ব্যবহার হয়েছে কিংবা ব্যাংকের পাওনা পরিশোধে তাদের পরিকল্পনা কী, সে বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে হাবিব গ্রুপের পাঁচ পরিচালক ইয়াকুব আলী, ইয়াসিন আলী, মাশরুফ হাবিব, সালমান হাবিব ও তানভীর হাবিবের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একইসঙ্গে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
গ্রুপসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এর আগেই ওই বছরের আগস্টে তারা দেশ ছাড়েন। ইয়াকুব আলী পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং ইয়াসিন আলী পরিবার নিয়ে দুবাইয়ে আছেন। তবে তাদের দেশ ছাড়ার সময় ও বর্তমান অবস্থান স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।