Print Date & Time : 02 November 2026 Monday 05:42 pm

গাজীপুরে পুলিশের গাড়িতে আগুন, বিজিবি-সাংবাদিকদের ওপর হামলা

image

গাজীপুর প্রতিনিধি: ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলজুড়ে টানা চতুর্থ দিনের মতো তীব্র বিক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছেন তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা।

সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকে উত্তাল এই আন্দোলনের মুখে গাজীপুর মহানগর ও কালিয়াকৈরের অন্তত দেড় শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। আন্দোলন চলাকালে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা মহানগরের নাওজোর ফ্লাইওভারের ওপর পুলিশের একাধিক গাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে ইট-পাটকেলের আঘাতে এক বিজিবি সদস্য এবং সংবাদ সংগ্রহকালে একাধিক গণমাধ্যমকর্মী হামলায় আহত হয়েছেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকেই কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, সফিপুর, মৌচাক এবং মহানগরীর ভোগড়া, নাওজোর ও সাইনবোর্ড এলাকায় শত শত শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান নেন। লাঠিসোঁটা হাতে তারা সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

শ্রমিক অসন্তোষের ব্যাপকতা ছড়িয়ে পড়লে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও কারখানা রক্ষার্থে আজ জেলার দেড় শতাধিক তৈরি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। কারখানা বন্ধ হলেও শ্রমিকেরা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ বজায় রাখেন। টানা চতুর্থ দিনের এই অবরোধে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে, যার ফলে চরম বিপাকে পড়েন দূরপাল্লার যাত্রী, রোগী ও সাধারণ পথচারীরা।

আন্দোলন চলাকালে মহাসড়ক থেকে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দিতে বিজিবি, শিল্প পুলিশ, জেলা ও মহানগর পুলিশ যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। বেলা ১১টার দিকে সফিপুর ও চন্দ্রা এলাকায় শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে ধাওয়া দিলে শ্রমিকেরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে এক বিজিবি সদস্য গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে বিজিবি ও পুলিশ পাল্টা ধাওয়া দিয়ে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।

দুপুর ১২টা থেকে ১টার দিকে গাজীপুর মহানগরীর নাওজোর এলাকায় পরিস্থিতি আরও সহিংস রূপ নেয়। উত্তেজিত শ্রমিকেরা সেখানে অবস্থানরত পুলিশের একাধিক গাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে নাওজোর ফ্লাইওভারের ওপর রাখা পুলিশের একটি গাড়িতে তারা আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে চৌরাস্তা মডার্ন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুর্ঘটনাস্থলে অগ্নিনির্বাপণের জন্য রওনা হলেও আন্দোলনকারী শ্রমিকদের তীব্র বাধার মুখে পেছনে ফিরে আসতে বাধ্য হন। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেশ কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন।

এদিকে, নাওজোর এলাকায় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। উত্তেজিত শ্রমিকেরা সময় টিভির রিপোর্টার ও ক্যামেরাপারসনের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের ব্যবহৃত ক্যামেরা ভাঙচুর করে। একই সময়ে ইটের আঘাতে এসএ টিভির চিত্রসাংবাদিক পায়ে মারাত্মক আঘাত পান। এছাড়া একাধিক সাংবাদিককে মারধর এবং তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

শিল্পাঞ্চলের সহিংস পরিস্থিতি ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সামাল দিতে সকাল থেকেই গাজীপুরে মোট ১০ প্লাটুন বিজিবি ও ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন করা হয়েছে।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল ইসলাম জানান, সকাল থেকে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চললেও পুলিশ ও যৌথ বাহিনী সর্বোচ্চ ধৈর্য ধরে মহাসড়কে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল থেকেই শ্রমিকেরা মহাসড়ক ও বিভিন্ন স্পটে বিক্ষোভ শুরু করায় নিরাপত্তার স্বার্থে দেড় শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। বিজিবি, জেলা পুলিশ, মহানগর পুলিশ ও শিল্প পুলিশ একযোগে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকলে শ্রমিকেরা সাময়িকভাবে সরে গেলেও তারা চলে যাওয়া মাত্রই আবার সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে।

সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও শ্রমিকেরা দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণায় স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম প্রধান এই শিল্পাঞ্চল।

—জা. অর্থনীতি/এনজে