আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতার সংকট, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নাগরিক স্বাধীনতার দাবিতে ফ্রান্সে দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ লিয়ঁ, মার্সেই, বোর্দো, রেন, গ্রেনোবল ও নঁতসহ প্রধান শহরগুলোতে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। দিনভর অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও বিকেল ও সন্ধ্যায় কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, দেশব্যাপী প্রায় ৪০ হাজার নিরাপত্তা ও পরিচয় তল্লাশি চালিয়ে মোট ৫৬৫ জনকে আটক করা হয়েছে।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এই সামাজিক আন্দোলনে তরুণ প্রজন্ম, উচ্চবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ (হলুদ জ্যাকেট) আন্দোলনের সমন্বয়করা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। গত ১৭ ও ২৪ অক্টোবরের পর ৩১ অক্টোবর ছিল আন্দোলনের তৃতীয় বড় জাতীয় কর্মসূচি। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, শ্রমিকদের মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি এবং সরকারি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়ানো। এছাড়া শিক্ষার্থীদের উন্নত শিক্ষার পরিবেশ ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বিধান, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অতিরিক্ত পুলিশি হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
শনিবারের এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যা নিয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং আয়োজক সংগঠনগুলোর তথ্যে বড় ধরনের অমিল দেখা গেছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ এই বিক্ষোভে অংশ নেন, যার মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ৭০ হাজার। তবে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর যৌথ প্ল্যাটফর্মের দাবি, দেশব্যাপী প্রায় ৫ লাখ মানুষ প্রতিবাদে শামিল হন এবং কেবল রাজধানীতেই এই সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ। অন্যদিকে প্যারিসে বিক্ষোভের ঐতিহাসিক রুট ‘বাস্তিল থেকে নেশন’ প্রশাসন বাতিল করে ‘পোর্ত দ্য বাগনোল থেকে পোর্ত দ্য শারঁতন’ পর্যন্ত বিকল্প রুট নির্ধারণ করে দেয়, যা পরে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালতেও বহাল থাকে। মিছিলের শেষভাগে শারঁতন এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং বাস্তিল চত্বর ও রু দ্য লা রোকেত এলাকায় কিছু অননুমোদিত জমায়েতের ঘটনাও ঘটে।
৩১ অক্টোবরের এই ব্যাপক প্রতিবাদের পর আন্দোলনকারীরা রাজপথে আরও কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী সর্বাত্মক ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি আগামী ৬ ও ৭ নভেম্বর ধর্মঘট অব্যাহত রাখা, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবরোধ কর্মসূচি পালন এবং নতুন আন্দোলনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের সমন্বয়করা। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং মৌলিক নাগরিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অনড় অবস্থানে থাকায় নভেম্বরের শুরুতে ফ্রান্সের সামগ্রিক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোচনা চলছে।
জেএ/অভি