Print Date & Time : 02 November 2026 Monday 03:57 am

তাপপ্রবাহে বাড়ছে গর্ভবতী নারী ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি

image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে গর্ভবতী নারী ও অনাগত সন্তানদের ওপর। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের কারণে গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, জন্মগত ত্রুটি এবং নির্ধারিত সময়ের আগে সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এমনকি যেসব দেশে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম, সেখানেও গড় তাপমাত্রার চেয়ে বেশি গরম পড়লে এসব ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভবতী নারীর বসবাসের এলাকার গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। একই সঙ্গে গর্ভপাত, জন্মগত ত্রুটি এবং গর্ভফুল বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে। অতিরিক্ত গরমে মায়ের উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। প্রি-এক্লাম্পসিয়া এমন একটি জটিলতা, যা থেকে কিডনি বিকল, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক হতে পারে। বিশ্বজুড়ে প্রতি সাতজন মাতৃমৃত্যুর একটির বেশি ঘটে এই জটিলতায়।

চীনের ২০ লাখ নারীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বাভাবিক গরমে প্রি-এক্লাম্পসিয়ার ঝুঁকি ১৩ শতাংশ বেড়ে যায়। এছাড়া চার মহাদেশের বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গর্ভবতী নারীর বসবাসের এলাকার গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পরবর্তী কয়েক দিনে সময়ের আগে সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি ৪ শতাংশ বাড়ে। তাপপ্রবাহের পরের সপ্তাহে এ ঝুঁকি বেড়ে যায় ২৬ শতাংশ।

রয়টার্স মেক্সিকোর ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮০ লাখের বেশি শিশুর জন্মসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, সন্তান জন্মের আগের চার সপ্তাহে তীব্র তাপপ্রবাহ বা সাধারণ তাপপ্রবাহ দেখা দিলে সময়ের আগে সন্তান জন্মের হার প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যায়। এতে প্রতিবছর গরমের মৌসুমে দেশটিতে ১ হাজার ৪০০টির বেশি শিশু নির্ধারিত সময়ের আগে জন্ম নেয়। তাপের সংস্পর্শ যত বাড়ে, ঝুঁকিও তত বাড়ে। মৃদু তাপের ক্ষেত্রে সময়ের আগে সন্তান জন্মের হার বাড়ে প্রায় ৪ শতাংশ। তবে সর্বোচ্চ তাপের সংস্পর্শে এ হার বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ শতাংশে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু দরিদ্র বা বেশি গরম অঞ্চলের নারীরাই ঝুঁকিতে নেই। বয়স্ক নারী, ধূমপায়ী, নিয়মিত ওষুধ সেবনকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত নারীদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যমজ সন্তান ধারণকারী নারীরাও তাপের কারণে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের চিকিৎসা গবেষক দর্শনিকা লাখু দীর্ঘদিন ধরে গর্ভাবস্থায় তাপমাত্রার প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তার দলের একটি গবেষণা বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী নেচার মেডিসিনে প্রকাশিত হয়। এর কয়েক দিন পরই তিনি নিজে নির্ধারিত সময়ের ছয় সপ্তাহ আগে যমজ সন্তানের জন্ম দেন।

গর্ভাবস্থায় লাখুর বসবাসের শহর জোহানেসবার্গে তীব্র গরম পড়েছিল। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার গর্ভাবস্থায় শহরটিতে ৭৪ দিন তাপপ্রবাহ ছিল। এর মধ্যে ৩০ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার শেষ মাসে অর্ধেকের বেশি দিন ছিল অতিরিক্ত গরম। গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই তার কিছু জটিলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকেরা গর্ভফুলে রক্তপ্রবাহের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করেন। পরে তার রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং প্রস্রাবে প্রোটিন পাওয়া যায়, যা প্রি-এক্লাম্পসিয়ার লক্ষণ। একপর্যায়ে গর্ভের যমজ শিশুর বেড়ে ওঠা বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসকেরা আগাম অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। তবে তার আগেই তার প্রসবব্যথা শুরু হয়। জন্মের পর শিশু দুটিকে শ্বাস নিতে সহায়তা দিতে হয় এবং কয়েক সপ্তাহ নিবিড় পরিচর্যায় রাখতে হয়।

লাখু মনে করেন, যমজ সন্তান ধারণের কারণে তার গর্ভাবস্থা আগে থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। তবে অতিরিক্ত গরম সেই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তার ভাষায়, গরমের কারণে সন্তান জন্মের সময় আরও এগিয়ে এসেছিল।

গবেষকেরা বলছেন, তাপমাত্রা ও গর্ভাবস্থার জটিলতার মধ্যে সম্পর্ক স্পষ্ট হলেও কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তাপপ্রবাহই সমস্যার কারণ কি না, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। নারীর বয়স, শারীরিক গঠন, আর্দ্রতা, বাতাসের প্রবাহ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সুযোগ এবং ঘরের নির্মাণপদ্ধতিসহ নানা বিষয় এতে প্রভাব ফেলে।

তাপ কীভাবে গর্ভাবস্থায় ক্ষতি করে, তা নিয়েও গবেষণা চলছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, অতিরিক্ত গরমে মায়ের শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে গর্ভফুল থেকে রক্তপ্রবাহ শরীরের অন্য অংশে সরিয়ে নিতে পারে। এতে ভ্রূণের ওপর চাপ তৈরি হয়। আবার তাপের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিঃসরণ ও ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠনের প্রক্রিয়াও ব্যাহত হতে পারে।

মেক্সিকো সিটির জুয়ারেজ হাসপাতালের চিকিৎসকেরা গরমের মৌসুমে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভফুল বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং সময়ের আগে সন্তান জন্মের ঘটনা বাড়তে দেখেছেন। এ পরিস্থিতিতে তারা গর্ভবতী নারীদের পর্যাপ্ত পানি পান, ঢিলেঢালা পোশাক পরা এবং দিনের অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা সময়ে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভবতী নারীদের তাপ থেকে সুরক্ষায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। গর্ভকালীন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় চিকিৎসক ও নার্সদের তাপের সংস্পর্শের বিষয়টিও জানতে হবে। রক্তচাপ বাড়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া গর্ভাবস্থায় নারীদের কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়ার সুযোগ, বিনা মূল্যে পানির ব্যবস্থা এবং চলমান শীতলীকরণ কেন্দ্র গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন গবেষকেরা।