Print Date & Time : 02 November 2026 Monday 04:00 am

সিসিটিসিএল ডিপোর নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দরের কাছে

image

সাইদুর রহমান, চট্টগ্রাম: চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় চট্টগ্রাম কনটেইনার ট্রান্সপোর্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (সিসিটিসিএল) ডিপোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)। একই সঙ্গে ডিপোটির কোড ব্যবহার করে নতুন আমদানি পণ্যের ঘোষণা ও রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে ডিপোতে থাকা কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান ব্যবসায়িক চুক্তি এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, হঠাৎ এই পরিবর্তনে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

গত ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনকে পাঠানো চিঠিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, সিসিটিসিএলের ডিপো কোড ব্যবহার করে নতুন আমদানি জেনারেল ম্যানিফেস্ট (আইজিএম) ঘোষণা গ্রহণ করা হবে না। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির নামে রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, গত ২১ অক্টোবর থেকে ডিপোতে থাকা সব কনটেইনারের দায়িত্ব তারা নিয়েছে। এখন নিজস্ব জনবল ও সরঞ্জাম দিয়ে ডিপোটি পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে ভবিষ্যতে ডিপোটি কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

২০০৪ সালে কার্যক্রম শুরু করা সিসিটিসিএল দুই দশকের বেশি সময় ধরে বন্দর কর্তৃপক্ষের ইজারা নেওয়া জায়গায় ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিল। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা গুটিয়ে নিতে আরও সময় চেয়েছে। সিসিটিসিএলের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) শহিদুল আলম নিগার বলেন, বকেয়া দায়দেনা পরিশোধ, ডিপোতে থাকা কনটেইনারের ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবসা সুশৃঙ্খলভাবে বন্ধ করতে তারা এক বছর সময় চেয়েছিলেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২১ এপ্রিল থেকে ২০ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ছয় মাসের জন্য চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েছিল।

নিগারের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর বিকালে বন্দর কর্তৃপক্ষের চিঠিতে পরদিন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা জানানো হয়। ওই দিন রাতেই আরেকটি চিঠিতে ২১ অক্টোবর থেকে ডিপোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। তিনি বলেন, এর আগে প্রতিষ্ঠানটি হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের স্থগিতাদেশ পেয়েছিল। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। এখন আরও সময় চেয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। নিগার বলেন, ‘শিপিং এজেন্টদের কাছে আমাদের পাওনা রয়েছে। ডিপোতে অনেক কনটেইনার আছে। ২০ থেকে ২৩ বছর ধরে কাজ করা কর্মীদের পাওনা পরিশোধ করতে হবে। সরঞ্জাম সরবরাহকারী ও শ্রমিকদের সঙ্গেও আমাদের চুক্তি রয়েছে। এসব নিষ্পত্তি করে ব্যবসা বন্ধ করতে সময় প্রয়োজন।’

ডিপোতে সরঞ্জামের সংকট ছিল— এমন অভিযোগও নাকচ করেন তিনি। তার দাবি, প্রতিষ্ঠানটির দুটি রিচ স্ট্যাকার রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি না থাকায় নতুন সরঞ্জাম কেনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অন্য ডিপোতে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য ইস্ট ওয়েস্ট কনটেইনার টার্মিনালস নামে তাদের আরেকটি প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম সরিয়ে নিতে সময় প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) সেক্রেটারি জেনারেল রুহুল আমিন সিকদার বলেন, সিসিটিসিএলের সঙ্গে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার ও শিপিং লাইনগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। ডিপোর কার্যক্রমে আকস্মিক পরিবর্তন হলে প্রতিষ্ঠানটির পাশাপাশি এসব পক্ষও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

তিনি বলেন, ডিপোতে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনারের পাশাপাশি খালি কনটেইনারও রয়েছে। হঠাৎ কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় কনটেইনার ব্যবস্থাপনা ও পণ্য খালাসে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এছাড়া বিভিন্ন শিপিং লাইনের সঙ্গে সিসিটিসিএলের চুক্তির মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি। কোনো কোনো চুক্তি আরও চার থেকে পাঁচ মাস বা আগামী বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে।

রুহুল আমিন সিকদারের প্রশ্ন, বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজে ডিপো পরিচালনা করলেও সিসিটিসিএলের সঙ্গে শিপিং লাইনগুলোর বিদ্যমান চুক্তি কীভাবে সামলানো হবে, তা এখনও পরিষ্কার নয়। তার মতে, চলমান কার্যক্রম ও চুক্তি সুষ্ঠুভাবে নিষ্পত্তির জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি নির্দিষ্ট সময় দেওয়া উচিত ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ডিপোটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বন্দর কর্তৃপক্ষই এটি পরিচালনা করছে। ভবিষ্যতে কীভাবে পরিচালিত হবে, তা বিবেচনাধীন রয়েছে।

২০০৩ সালে নিবন্ধিত সিসিটিসিএল একটি বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ। প্রতিষ্ঠানটি আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার ব্যবস্থাপনা, রপ্তানি পণ্যের স্টাফিং ও আনস্টাফিং এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য গুদামসেবা দিয়ে আসছিল। ডিপোটির নিয়ন্ত্রণ বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে যাওয়ায় সিসিটিসিএলের পরিচালনাগত ভূমিকার অবসান ঘটেছে। তবে ডিপোতে থাকা কনটেইনারের ব্যবস্থাপনা, শিপিং লাইনগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তি, কর্মীদের পাওনা এবং প্রতিষ্ঠানের বকেয়া দায়দেনা নিষ্পত্তির বিষয়গুলো এখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে। এসব বিষয়ে দ্রুত সমাধান না হলে সংশ্লিষ্ট আমদানি-রপ্তানিকারক ও অন্যান্য ব্যবসায়ীর কার্যক্রমে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।