অনলাইন ডেস্ক: দৈনন্দিন ব্যস্ত জীবনে সকালে সঠিক সময়ে ঘুম থেকে ওঠার জন্য অ্যালার্মের ওপর নির্ভরতা এখন একটি সাধারণ চিত্র। তবে ঘুম গবেষকদের মতে, নিয়মিত কিছু শৃঙ্খলাপূর্ণ অভ্যাস গড়ে তুললে অ্যালার্ম ছাড়াই শরীরের প্রাকৃতিক সার্কাডিয়ান ছন্দ বা নিজস্ব জৈবঘড়ির সহায়তায় সময়মতো সতেজভাবে জেগে ওঠা সম্ভব। এর জন্য সবার আগে নিজের শরীরের প্রয়োজনীয় ঘুমের সঠিক পরিমাণ জানা অত্যন্ত জরুরি। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সাধারণত প্রতি রাতে গড়ে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হলেও ব্যক্তিভেদে এই চাহিদার তারতম্য হতে পারে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে কোনো ধরনের তাড়া বা অ্যালার্ম ছাড়া শরীর স্বাভাবিকভাবে কখন জেগে উঠছে, তা পর্যবেক্ষণ করে একজন মানুষ সহজেই নিজের প্রয়োজনীয় ঘুমের সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারেন।
অ্যালার্মবিহীন সকাল নিশ্চিত করতে ঘুমানো ও ওঠার সময়সূচিতে নিয়মিত ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। গবেষকদের পরামর্শ হলো প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে বিছানায় যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠা, যা শরীরকে একটি নির্দিষ্ট সময়চক্রে অভ্যস্ত করে তোলে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশের আলো শরীরের জন্য একটি প্রাকৃতিক সংকেত হিসেবে কাজ করে। সকালে চোখে আলো লাগার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুম সৃষ্টিকারী হরমোন মেলাটোনিনের মাত্রা কমতে থাকে এবং কর্টিসল বেড়ে শরীরকে সক্রিয় করে তোলে। তাই সকালে ঘুম ভাঙার পরপরই ঘরে উজ্জ্বল প্রাকৃতিক আলো প্রবেশ করানো এবং রাতে ঘুমানোর সময় ঘরটি সম্পূর্ণ অন্ধকার রাখা শরীরের প্রাকৃতিক ছন্দের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
একটি নিরবচ্ছিন্ন ও গভীর ঘুমের প্রস্তুতির জন্য শোয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে থেকেই মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত কাজের ব্যস্ততা কমিয়ে আনা প্রয়োজন। রাতে ঘরের বাতি কমিয়ে দেওয়া, আরামদায়ক পোশাক পরা এবং বই পড়ার মতো শান্ত কোনো কাজে সময় কাটালে শরীর মেলাটোনিন তৈরি করে ঘুমের জন্য দ্রুত প্রস্তুত হতে পারে। একই সঙ্গে ঘরের তাপমাত্রার দিকেও বিশেষ নজর দিতে হয়। ঘুমের সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়, ফলে অতিরিক্ত গরম পরিবেশে ঘুমে বারবার ব্যাঘাত ঘটে এবং সকালে সতেজভাবে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ঘরের সহনশীল তাপমাত্রা, ফ্যান বা এসির সঠিক ব্যবহার এবং হালকা বিছানাপত্র আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ নিশ্চিত করে।
বর্তমান সময়ে সময়মতো ঘুম না আসার পেছনে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বিছানায় অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহারের অভ্যাস। ফোনের নীল আলো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘ সময় স্ক্রল করার প্রবণতা মস্তিষ্কে কৃত্রিম দিনের সংকেত পাঠায়, যার ফলে স্বাভাবিক ঘুম অনেকটাই পিছিয়ে যায়। নরওয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত বড় আকারের এক গবেষণাতেও স্মার্টফোনের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের সঙ্গে ঘুমের গুরুতর ব্যাঘাতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই সমস্যা সমাধানে ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার সম্পন্ন করা, অতিরিক্ত ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা এবং ঘুমানোর সময় ফোনটি বিছানা থেকে দূরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
দীর্ঘদিনের অনিয়মিত ঘুমের সময়সূচি একদিনেই হঠাৎ বদলে ফেলা সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞদের মত। তাই কারও ঘুমের সময়সূচি পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট করে সময় এগিয়ে এনে ধীরে ধীরে কাঙ্ক্ষিত রুটিনে পৌঁছানো উচিত। মানবদেহের অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ি রাতারাতি পরিবর্তিত হয় না; ফলে নিয়মমাফিক ধৈর্য ধরে অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি করলেই একসময় শরীর কৃত্রিম কোনো সংকেত বা অ্যালার্ম ছাড়াই নিজে থেকে সঠিক সময়ে জেগে ওঠার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পায়।
জেএ/অভি