জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: একটি বড় ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা উধাও হলো। সরকারি কেনাকাটায় অস্বাভাবিক দাম দেখানো হলো। বিদেশে পাচার হলো বিপুল অর্থ। এসব অনিয়মের খবর সাধারণ মানুষের সামনে আনবে কে? এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। কারণ নথি, সাক্ষ্য, হিসাব আর মাঠপর্যায়ের তথ্য মিলিয়ে সাংবাদিকরাই অনেক সময় এমন দুর্নীতির চিত্র সামনে আনেন, যা ক্ষমতাবানরা আড়াল রাখতে চান।
বিশ্বে এর বড় উদাহরণ মাল্টার সাংবাদিক ডাফনে কারুয়ানা গালিজিয়া। তিনি রাজনীতি, বড় ব্যবসা, অর্থপাচার ও দুর্নীতির যোগসূত্র নিয়ে লিখতেন। ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবর গাড়িবোমা হামলায় তাকে হত্যা করা হয়। পানামা পেপার্সের তথ্য ধরে তার অনুসন্ধানও চলছিল। হত্যাকাণ্ডে কয়েকজন দণ্ডিত হলেও, মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে আদালতে খালাস পান; পরে সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়।
স্লোভাকিয়ার সাংবাদিক ইয়ান কুচিয়াক কর ফাঁকি, ব্যবসায়িক জালিয়াতি ও রাজনীতির সঙ্গে অপরাধী চক্রের সম্ভাব্য যোগসূত্র অনুসন্ধান করছিলেন। ২০১৮ সালে তাকে ও তার বাগদত্তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার প্রতিবেদন দুর্নীতি নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে। তবে হত্যার বিচারপ্রক্রিয়া ও দায়ীদের জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি।
বাংলাদেশেও দুর্নীতি ও অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের হয়রানি, মামলা, হুমকি ও হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। ২০২১ সালে প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি, নিয়োগে ঘুষ এবং করোনার চিকিৎসাসামগ্রী কেনাকাটায় অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করেছিলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তাকে প্রায় ছয় ঘণ্টা আটকে রাখার পর গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অফিশিয়াল সিক্রেটস আইনে মামলা হয়। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা পরে বলেন, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্ত ও মামলা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতিশোধ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে উদ্বেগ রয়েছে।
২০২৪ সালে ধান-তুলা শিল্পে কর ফাঁকির অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিক আল এহসানের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা হয় বলে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন আইএফজে জানায়। ২০২৫ সালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়ায়। গাজীপুরে আসাদুজ্জামান তুহিনকে হত্যা করা হয়; তার মৃত্যুর আগে তিনি চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র হামলার ঘটনা ধারণ করেছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে আসে।
তবে সাংবাদিকতা একা দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে না। এটি তথ্য প্রকাশ করে, প্রশ্ন তোলে এবং তদন্তের চাপ তৈরি করে। এরপর প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত, আদালতের কার্যকর ভূমিকা এবং তথ্যদাতাদের সুরক্ষা। সাংবাদিককে ভয় দেখিয়ে থামানো হলে ক্ষতি শুধু গণমাধ্যমের নয়; রাষ্ট্রের অর্থ, জনগণের অধিকার এবং জবাবদিহিও অন্ধকারে থেকে যায়। সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তথ্য অধিকার কার্যকর রাখা, হুইসেলব্লোয়ারদের পরিচয় গোপন রাখা এবং ভয়ভীতি বা হয়রানির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানগুলোরও উচিত নথি ও ব্যাখ্যা জনসমক্ষে আনা স্বচ্ছভাবে।
হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, অর্থপাচার কিংবা সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম—এসব ফাঁস করতে গিয়ে সাংবাদিকদের অনেক সময় নিজের জীবনও ঝুঁকিতে ফেলতে হয়। মাল্টার সাংবাদিক ডাফনে কারুয়ানা গালিজিয়া দুর্নীতি ও অর্থপাচার নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে গাড়িবোমা হামলায় নিহত হন। বাংলাদেশে রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদন করে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। সাংবাদিক আল এহসান কর ফাঁকির খবর প্রকাশের পর মামলার মুখে পড়েন। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্নীতি ফাঁসের মূল্য কি সাংবাদিকদের জীবন ও স্বাধীনতা দিয়ে দিতে হবে?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি