মীরসরাই (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে সার পাচারের একটি নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে চট্টগ্রামের মীরসরাই, সীতাকুণ্ড ও সন্দ্বীপ চ্যানেল। একদিকে যখন দেশের কৃষকরা ফসলের মাঠের জন্য সারের তীব্র সংকটে ভুগছেন, অন্যদিকে ঠিক তখনই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এসব সার চলে যাচ্ছে বাইরে। শুধু সারই নয়, একই রুট ব্যবহার করে ডিজেল ও সিমেন্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ও মূল্যবান পণ্যও দেদারছে পাচার করছে একটি সক্রিয় চোরাচালান চক্র।
বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে মীরসরাইয়ে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল ‘বাংলাদেশ স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ (এসইজেড)। এই জোনকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়েছে বিশালাকার মেরিন ড্রাইভ সড়ক। মূলত এই সড়ক ও উপকূলীয় ভৌগোলিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সার, ডিজেল ও সিমেন্ট পাচারের নিরাপদ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে একটি অপরাধী চক্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কৃষকদের সোনালী ফসল ফলাতে সরকার ভর্তুকি মূল্যে সার সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু সেই ভর্তুকির সারই এখন ইয়াবা ট্যাবলেটের মতো ভয়ংকর মাদকের বিনিময়ে অবৈধভাবে পাচার করা হচ্ছে। পাচারকাজে যে ট্রলারে করে সার পাঠানো হচ্ছে, ফেরার পথে ঠিক একই ট্রলারে করে দেশে আসছে ইয়াবার বড় বড় চালান।
সাম্প্রতিক সাঁড়াশি অভিযান ও জব্দের চিত্র:
সর্বশেষ গত ৩১ অক্টোবর ভোরের দিকে মীরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের ৪০ নম্বর গেট সংলগ্ন এলাকা থেকে দুটি ট্রাকে থাকা ৩০১ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে জোরারগঞ্জ থানা-পুলিশ। এ সময় চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সন্দেহভাজন আটজনকে আটক করা হয়।
এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ৯৭৫ বস্তা ইউরিয়া সারসহ তিনজনকে আটক করেছিল বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। সে সময় তাদের ব্যবহৃত তিনটি ট্রাক ও একটি মাছ ধরার ট্রলার জব্দ করা হয়। তবে কোস্ট গার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে চক্রের মূল হোতারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
এ ছাড়া গত ২৩ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে ৬০০ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করে কোস্ট গার্ড। ওই অভিযানে সার পরিবহনে ব্যবহৃত দুটি ট্রাকসহ দুজনকে আটক করা হয়। এর আগেও গত ১০ সেপ্টেম্বর বাঁশবাড়িয়া এবং ১ সেপ্টেম্বর সীতাকুণ্ড উপকূল থেকে অনুরূপ সার জব্দ করেছিল কোস্ট গার্ড।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য:
মীরসরাই কোস্ট গার্ডের পিআইও মো. রবিউল হোসেন জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পাচারকালে জব্দ করা সার ও অন্যান্য পণ্যের চালানগুলো বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, চোরাকারবারিরা এই রুটটি পুনরায় ব্যবহারের পাঁয়তারা করছে। তবে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কঠোর নজরদারি ও তৎপরতার কারণে তারা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। সাগরপথে এ ধরনের অপরাধ ও চোরাচালান রোধে কোস্ট গার্ডের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম বলেন, "সাম্প্রতিক সময়ে মীরসরাইয়ের উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবহার করে একটি চক্র সার পাচার চালিয়ে আসছে- এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের হাতে রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত ৩১ অক্টোবর আমরা ৩০১ বস্তা ইউরিয়া সার জব্দ করেছি। এ ঘটনায় আটককৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রকৃত আসামিদের মুখোশ উন্মোচন করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত এই উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে ওঠা চোরাকারবারী সিন্ডিকেটের শেকড় উৎপাটন করা না গেলে একদিকে যেমন কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে মাদকের আগ্রাসনে ধ্বংস হয়ে যাবে যুবসমাজ। তাই নৌ ও স্থলপথে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি