Print Date & Time : 01 November 2026 Sunday 02:53 pm

ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ২৬ মার্কিন ঘাঁটি-স্থাপনা ধ্বংস

image

জাতীয় অর্থনীতি আন্তর্জাতিক: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দুই ডজনের বেশি সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে ইরান। প্রথমে আগাম হামলার সতর্কতা শনাক্তকারী রাডার ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু করার পর বিমান, সামরিক সরঞ্জাম ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায় তেহরান। এতে শত শত কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।

এপির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগস্ট পর্যন্ত ইরান অথবা ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দাবি করা ১১৫টির বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম থাকা ২৬টি সামরিক ঘাঁটি ও অন্যান্য স্থাপনার অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। একাধিক স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারীর ছবি স্বাধীনভাবে যাচাই করার পাশাপাশি হামলায় কী কী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে অথবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ব্রিফিং পেয়েছেন- এমন চারজন আঞ্চলিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে এপি।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইরান শুরুতে বিমান রাখার হ্যাঙ্গার এবং শত্রুপক্ষের হামলা শনাক্তকারী ব্যবস্থাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে গুদাম, সেনাসদস্যদের আবাসন এবং অন্যান্য স্থাপনায় হামলার পথ তৈরি হয়। এ হামলার ক্ষয়ক্ষতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে।

আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের অনেক সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং ঘাঁটির কার্যক্রম সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। এই ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালাবেন কিনা তা বিবেচনা করছেন। অন্যদিকে তেহরান বড় ধরনের পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। নতুন করে সংঘাত শুরু হলে সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আরও বড় আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। যুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্র এসব ঘাঁটি ও সরঞ্জাম আবারও নির্মাণ বা পুনঃস্থাপন করবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

এপির বিশ্লেষণে আট মাসের যুদ্ধে ইরানের পাল্টা হামলার কৌশল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ঠিক কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার নতুন চিত্র উঠে এসেছে। পেন্টাগনের ইন্সপেক্টর জেনারেলসহ স্বাধীন পর্যালোচনাগুলোর প্রকাশিত তথ্যেও এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে ইরানের হামলায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোর শত শত ভবন ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

আগাম হামলা শনাক্তকারী মার্কিন রাডার ছিল প্রাথমিক লক্ষ্য
যুদ্ধ শুরুর পর ইরান প্রথমে শত্রুপক্ষের হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করার জন্য তৈরি ব্যবস্থাগুলোতে নির্ভুল হামলা চালায়। এরপর মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে কার্যকর ও বসবাসযোগ্য রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ভবন ও সরঞ্জাম লক্ষ্য করে হামলার পরিধি বাড়ায়।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দুই দিনের মধ্যে কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান এবং বাহরাইনের নেভাল সাপোর্ট অ্যাক্টিভিটির মার্কিন রাডারব্যবস্থাগুলোর সুরক্ষায় নির্মিত কাঠামো ধ্বংস করে ইরান। পাশাপাশি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে স্থাপন করা বহনযোগ্য রাডারেও হামলা চালানো হয়।

প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আর্মামেন্ট রিসার্চ সার্ভিসেসের পরিচালক এন আর জেনজেন-জোনস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ আগাম সতর্কতামূলক রাডারগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করে ইরান। এসব রাডার মেরামত বা প্রতিস্থাপন করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল।

জর্ডানে একটি রাডার হামলায় ধ্বংস হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রেথিয়নের তথ্য অনুযায়ী, এটি বিশ্বজুড়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে থাকা মাত্র ১৩টি রাডারের একটি। বাজেটসংক্রান্ত নথিতে প্রতিটির দাম প্রায় ৫০ কোটি ডলার বলে উল্লেখ রয়েছে।

কাতারের আরেকটি রাডারও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সেটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ২০১৩ সালে ১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তির মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশটি রাডারটি কিনেছিল। ওই অঞ্চলে এ ধরনের এটিই একমাত্র রাডার বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাডারগুলোতে হামলার পর যুদ্ধের প্রথম মাসেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম থাকা ১৮টি স্থানে ৫০টির বেশি সফল হামলা চালায় ইরান। এসব হামলায় বিমানসংক্রান্ত স্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, যোগাযোগব্যবস্থা, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং সেনাসদস্যদের আবাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মার্চে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের একটি হামলায় বোয়িং ই-৩ সেন্ট্রি নজরদারি বিমানের পেছনের অর্ধেক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আরেকটি হামলায় রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের একটি সিআইএ ইউনিটও আঘাতের শিকার হয়। সৌদি বিমানঘাঁটিটি সম্প্রতি পরিদর্শন করা আরেক সামরিক কর্মকর্তা এপিকে জানান, সেখানে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ এবং ভাঙা নির্মাণসামগ্রী দেখেছেন তিনি।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নজরদারি বিমানটিতে আঘাত হানা হামলায় আরও কয়েকটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে দুটি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকারও ছিল। অক্টোবরে হালনাগাদ করা কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫টি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি থেকে প্রায় ২০ মাইল বা ৩২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত আল ধাফরা বিমানঘাঁটিও যুদ্ধের শুরুর দিকে বারবার হামলার শিকার হয়। ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা রয়েছে এমন আরেক আঞ্চলিক সামরিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেখানে বিমান রাখার হ্যাঙ্গারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো এবং আগাম সতর্কতামূলক রাডার ও নজরদারি ড্রোনের মতো সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রকাশে বিলম্ব করা হয়েছে স্যাটেলাইট চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহকারী কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মকর্তাদের অনুরোধে প্রকাশ্য স্যাটেলাইট চিত্র সরবরাহ বন্ধ রেখেছে অথবা প্রকাশে বিলম্ব করেছে। কর্মকর্তারা কখনো কখনো জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে এমন অনুরোধ জানিয়েছেন।

ফলে নির্ভরযোগ্য স্যাটেলাইট সরবরাহকারী এয়ারবাসের মালিকানাধীন ওয়ানঅ্যাটলাস থেকে চিত্র সংগ্রহ করার আগপর্যন্ত হামলার ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমানভাবে যাচাই করার সুযোগ সীমিত ছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ঘাঁটিগুলোর একটি কুয়েতের ক্যাম্প বুয়েরিংয়ের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চমানের স্যাটেলাইট চিত্র আগস্টের শেষ দিকে পাওয়া যায়। মার্চের শুরুতে চিত্র প্রকাশ বন্ধ হওয়া থেকে আগস্টে তা আবার পাওয়া পর্যন্ত ঘাঁটিটির ৩০টির বেশি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

এপি নিশ্চিত করেছে, মার্চ, এপ্রিল, মে ও জুলাই- এই চার মাসেই ক্যাম্প বুয়েরিংয়ে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে ইরান। কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও যুদ্ধের পরিণতি বা সমাপ্তি নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা সামনে আসেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই নতুন করে সংঘাত শুরুর সম্ভাবনার কথা বলছে। ফলে সামরিক ঘাঁটিগুলোতে আরও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

—জা. অর্থনীতি/এএইচএ