ফিয়াদ নওশাদ ইয়ামিন: যুবসমাজ একটি দেশের ভবিষ্যৎ। একটি দেশ কতটা এগিয়ে যাবে, তার অনেকটাই নির্ভর করে তরুণ প্রজন্ম কতটা শিক্ষিত, দক্ষ, সুস্থ, সচেতন ও কর্মক্ষম হয়ে উঠছে তার ওপর। তাই যুবকদের প্রয়োজন বোঝা, তাদের অধিকার ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং শিক্ষা থেকে স্বনির্ভর হওয়ার পথে সহায়তা করা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী যুব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে এই বয়সসীমার মানুষের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৫০ লাখ ৫২ হাজার ৮৭২ জন, যা তখনকার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এত বড় জনগোষ্ঠী দেশের জন্য যেমন- সম্ভাবনা, তেমনি তাদের যথাযথভাবে গড়ে তুলতে না পারলে বড় চ্যালেঞ্জও হয়ে উঠতে পারে। যুবসমাজ দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করার পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশেও অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করছেন। কিন্তু ডিগ্রি অর্জনের পরও উপযুক্ত কাজ না পাওয়া অনেক তরুণের হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় বা তৃতীয় স্তরের শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। বেকার স্নাতকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। এই সংখ্যা দেখায়, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেই কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে শুধু শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করলেই চলবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কী শেখানো হচ্ছে, চাকরির বাজারে কী ধরনের দক্ষতা চাওয়া হচ্ছে এবং নতুন স্নাতকদের জন্য কতটা কাজ তৈরি হচ্ছে, সেগুলোও দেখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়োগদাতা ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ, পেশাগত প্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার পরামর্শ, গবেষণা ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তাদের স্নাতকদের কর্মসংস্থান নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করতে হবে।
বিশ্বের অনেক দেশে জন্মহার কমে যাওয়া এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার কারণে কর্মক্ষম মানুষের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইতালি, জার্মানি ও স্পেনের মতো দেশে বিভিন্ন খাতে বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন হয়। এসব দেশে বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের ও দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল দেশ থেকে কর্মী যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বিদেশে কাজের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থ দেশের পরিবার, শিক্ষা, আবাসন ও অর্থনীতিতে অবদান রাখে। তবে বিদেশে কাজ করতে গিয়ে কেউ যেন প্রতারণা, অতিরিক্ত ঋণ, অদক্ষতার কারণে কম মজুরি কিংবা অনিরাপদ কর্মপরিবেশের শিকার না হন, সেজন্য প্রশিক্ষণ, ভাষাশিক্ষা, বৈধ নিয়োগ ও অভিবাসন-সংক্রান্ত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একজন তরুণ দেশে নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সম্মানজনক আয় করতে পারলে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে পারবেন। বিদেশে যাওয়া কিংবা দেশে থাকা— দুটিই যেন তরুণদের জন্য বাস্তবসম্মত ও নিরাপদ বিকল্প হয়।
বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ ও ব্যবসার অনেক সুযোগ রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক। ফলে বিভিন্ন জেলার তরুণদের ভালো প্রশিক্ষণ, চাকরি কিংবা ব্যবসার সুযোগ পেতে নিজ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র যেতে হয়। এতে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং অনেকের পক্ষে সুযোগ গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি ব্যবসার সুযোগ জেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী কোথাও কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোথাও পর্যটন, প্রযুক্তি, উৎপাদন কিংবা সেবামূলক খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। জাতীয় যুব দিবসের প্রকৃত সার্থকতা হবে তখনই, যখন দিবসের বক্তব্য বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেবে এবং দেশের তরুণেরা নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
শিক্ষার্থী, মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ