জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: পরিবারে টাকা-পয়সা থাকলেই কি সত্যিকারের সুখ-শান্তি আসে? একটি পরিবারে ভালোবাসা, সম্মান ও পারস্পরিক বোঝাপড়া না থাকলে বড় ঘরও কখনো কখনো অশান্তির জায়গা হয়ে উঠতে পারে। ইসলাম পরিবারকে শুধু আত্মীয়তার সম্পর্ক হিসেবে দেখেনি, বরং দায়িত্ব, ভালোবাসা, ক্ষমা ও পারস্পরিক অধিকারের বন্ধন হিসেবে দেখেছে। স্বামী-স্ত্রী থেকে শুরু করে সন্তান ও বাবা-মা প্রত্যেকের জন্যই রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তাহলে পরিবারে শান্তি ধরে রাখতে ইসলাম আমাদের কী করতে বলে?
একটি পরিবার সুখী হয় কীভাবে? শুধু অর্থ, বড় বাড়ি কিংবা ভালো চাকরি দিয়ে কি একটি পরিবারে শান্তি নিশ্চিত করা যায়?
ইসলামের শিক্ষা বলছে, পারিবারিক শান্তির ভিত্তি হলো ভালোবাসা, দয়া, সম্মান, দায়িত্ববোধ এবং একে অন্যের অধিকার রক্ষা করা। কোরআনের সূরা রূমে আল্লাহ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ দাম্পত্য সম্পর্ক শুধু সামাজিক বা পারিবারিক দায়িত্ব নয়, বরং একে অন্যের জন্য শান্তির উৎস হওয়ারও একটি সুযোগ।
প্রথম শিক্ষা পরস্পরের সঙ্গে ভালো আচরণ করা।
স্বামী-স্ত্রী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নন। রাগের সময় অপমানজনক কথা বলা, পুরোনো ভুল বারবার সামনে আনা কিংবা ছোট করে কথা বলা সম্পর্ককে দুর্বল করে। ইসলাম সুন্দর কথা ও উত্তম আচরণের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে।
দ্বিতীয় শিক্ষা, একে অন্যের অধিকার আদায় করা। পরিবারে প্রত্যেকেরই কিছু দায়িত্ব রয়েছে। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার, সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের দায়িত্ব এবং বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব—এসবকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শুধু নিজের অধিকার দাবি না করে অন্যের অধিকারও পূরণ করা পারিবারিক শান্তির অন্যতম ভিত্তি।
তৃতীয় শিক্ষা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা।
পরিবারে মতবিরোধ হতেই পারে। কিন্তু মতবিরোধ যেন অপমান, গালাগালি কিংবা সহিংসতায় পরিণত না হয়। কোরআন ও হাদিসে রাগ সংবরণ এবং ক্ষমা করার প্রশংসা করা হয়েছে। কখনো কখনো একটি ঝগড়া থামানোর সবচেয়ে শক্তিশালী বাক্য হতে পারে, “আমি এখন রাগের মধ্যে আছি, একটু পরে কথা বলি।”
চতুর্থ শিক্ষা, ক্ষমা করা ও ভুল সংশোধনের সুযোগ দেওয়া।
একটি পরিবারে সবাই ভুল করতে পারে। প্রতিটি ভুলকে সারাজীবনের অভিযোগে পরিণত করলে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। তাই সম্ভব হলে ক্ষমা করা, ভুল স্বীকার করা এবং সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করা উচিত।
পঞ্চম শিক্ষা, সন্তানদের সঙ্গে ভালো আচরণ ও সময় দেওয়া।
সন্তান শুধু খাবার, পোশাক ও পড়াশোনার দায়িত্ব নয়। তাদের কথা শোনা, ভালোবাসা দেওয়া, নৈতিক শিক্ষা দেওয়া এবং সঠিক পরিবেশ তৈরি করাও বাবা-মায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ষষ্ঠ শিক্ষা, বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান। বিশেষ করে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে নম্র আচরণের ওপর কোরআনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে বিরক্তি প্রকাশ না করে সম্মান ও যত্নের সঙ্গে আচরণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
আর পরিবারের শান্তির জন্য আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, গোপনীয়তা ও বিশ্বাস রক্ষা করা।
স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় বাইরে প্রকাশ করা, পরিবারের সদস্যের দুর্বলতা নিয়ে অন্যের কাছে আলোচনা করা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পারিবারিক বিরোধ ছড়িয়ে দেওয়া সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
এর পাশাপাশি পরিবারে একসঙ্গে নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত করা, একে অন্যকে ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া এবং আল্লাহর কাছে পরিবারের জন্য দোয়া করা আত্মিক বন্ধন শক্তিশালী করতে পারে।
কোরআনে মুমিনদের একটি দোয়া শেখানো হয়েছে,“রব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আইউনিওঁ, ওয়াজআলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা।”
অর্থাৎ, “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ করুন।“ শেষ কথা হলো, সুখী পরিবার মানে যেখানে কখনো মতবিরোধ হয় না, এমন পরিবার নয়।
বরং সুখী পরিবার হলো এমন একটি পরিবার, যেখানে মতবিরোধ হলেও মানুষ একে অন্যকে সম্মান করে, ভুল হলে ক্ষমা চায়, ক্ষমা করে এবং সম্পর্কটাকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। ইসলামের পারিবারিক শিক্ষা তাই খুব সহজ, অধিকার চাইতে হলে দায়িত্বও পালন করতে হবে, ভালোবাসা পেতে হলে ভালোবাসতে হবে, আর শান্তি চাইলে ঘর থেকেই শান্তির চর্চা শুরু করতে হবে।
ইসলামে সুখী পরিবারের ভিত্তি শুধু অর্থ নয়, ভালোবাসা, দয়া, সম্মান ও দায়িত্ববোধ। স্বামী-স্ত্রীর একে অন্যের অধিকার আদায় করা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা, ভুল হলে ক্ষমা করা এবং সন্তানদের সময় দেওয়া, এসব পারিবারিক শান্তির গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। একই সঙ্গে বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান এবং পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয় গোপন রাখাও জরুরি। পরিবারে একসঙ্গে ইবাদত করা ও আল্লাহর কাছে পরিবারের জন্য দোয়া করাও আত্মিক বন্ধন বাড়াতে পারে। কারণ শান্তিপূর্ণ পরিবার মানে মতবিরোধহীন পরিবার নয়, বরং মতবিরোধের মধ্যেও ভালোবাসা ও সম্মান ধরে রাখা।
একটি পরিবারে অশান্তি শুরু হয় অনেক সময় বড় কোনো কারণে নয়, ছোট ছোট আচরণ থেকে। অপমানজনক কথা, রাগের সময় সীমা না মানা কিংবা একে অন্যের কথা না শোনা সম্পর্ক দুর্বল করে। ইসলাম তাই পরিবারে সুন্দর আচরণ, পারস্পরিক অধিকার, ক্ষমা ও দয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রীকে একে অন্যের জন্য শান্তির কারণ হতে বলা হয়েছে, সন্তানদের ভালোবাসা ও নৈতিক শিক্ষা দিতে বলা হয়েছে এবং বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সুখী পরিবার গড়ার শুরুটা হতে পারে নিজের আচরণ পরিবর্তন থেকেই।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি