Print Date & Time : 02 November 2026 Monday 03:58 pm

পানি আর বিদ্যুৎ যার কাছে আছে, সে-ই হবে আগামীর দুনিয়ায় রাজা (ভিডিও)

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ কি আর ডেটা নয়, বিদ্যুৎ হতে যাচ্ছে? এআই চালাতে প্রয়োজন বিশাল ডেটা সেন্টার, আর এসব ডেটা সেন্টার চালাতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ। তাই ভবিষ্যতের এআই প্রতিযোগিতা হয়তো শুধু চিপ বা মডেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যে দেশ সস্তা, নির্ভরযোগ্য ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ দিতে পারবে, সেই দেশই কি হয়ে উঠবে এআই অর্থনীতির নতুন শক্তিধর?

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতার কথা উঠলেই আমরা সাধারণত চিপ, ডেটা কিংবা বড় এআই মডেলের কথা ভাবি। কিন্তু এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে আরেকটি মৌলিক সম্পদ। বিদ্যুৎ!

 

কারণ এআই মডেল প্রশিক্ষণ ও চালানোর জন্য বিশাল কম্পিউটিং অবকাঠামো প্রয়োজন। হাজার হাজার চিপ একসঙ্গে কাজ করে ডেটা সেন্টারে। সেই কম্পিউটার চালাতে যেমন বিদ্যুৎ লাগে, তেমনি প্রচুর তাপ উৎপন্ন হওয়ায় ঠান্ডা রাখতেও শক্তি প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা বা আইইএর হিসাবে, বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারগুলো ২০২৪ সালে প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ব্যবহার দ্বিগুণের বেশি হয়ে প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। আর এই বাড়তি চাহিদার অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হবে এআই।

তবে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের তুলনায় সংখ্যাটি এখনো খুব বড় নয়। সমস্যা হচ্ছে, ডেটা সেন্টারগুলো নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় দ্রুত বাড়ছে। ফলে স্থানীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে চাপ তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আইইএর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৯ শতাংশ ডেটা সেন্টার থেকে আসতে পারে। অর্থাৎ এআই অর্থনীতির বিস্তার সরাসরি বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি করছে।

এখানেই শুরু হচ্ছে নতুন জ্বালানি প্রতিযোগিতা। প্রথম বিকল্প সৌর ও বায়ু শক্তি। এগুলো তুলনামূলকভাবে দ্রুত স্থাপন করা যায় এবং নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির খরচও অনেক ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক। কিন্তু সূর্য ও বাতাস সবসময় পাওয়া যায় না। তাই এআই ডেটা সেন্টারের জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ দিতে ব্যাটারি, গ্রিড ও অন্যান্য উৎস প্রয়োজন হবে।

দ্বিতীয় বড় সম্ভাবনা পারমাণবিক শক্তি। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ দিতে পারে। এআই ডেটা সেন্টারের বড় ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে প্রযুক্তি কোম্পানি ও বিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠানগুলো পারমাণবিক শক্তির দিকে নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আইইএও বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ডেটা সেন্টারের বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য শক্তি ও পারমাণবিক শক্তি দুই ধরনের উৎসই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গ্রিড

নতুন ডেটা সেন্টার বানানো তুলনামূলক সহজ হতে পারে, কিন্তু সেই ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে নতুন ট্রান্সমিশন লাইন, সাবস্টেশন ও অন্যান্য অবকাঠামো তৈরি করতে সময় লাগে। ফলে অনেক জায়গায় এআই অবকাঠামোর সম্প্রসারণের গতি নির্ভর করবে বিদ্যুৎ গ্রিড কত দ্রুত বাড়ানো যায় তার ওপর।
এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ শুধু একটি ইউটিলিটি নয়, হয়ে উঠতে পারে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

যে দেশে নির্ভরযোগ্য ও তুলনামূলক সস্তা বিদ্যুৎ রয়েছে, সেখানে ডেটা সেন্টার স্থাপন করা সহজ হতে পারে। আর ডেটা সেন্টারের সঙ্গে আসবে বিনিয়োগ, চাকরি, প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং নতুন ডিজিটাল ব্যবসা।

তবে ‘বিদ্যুৎই নতুন তেল’ কথাটিকে আক্ষরিক অর্থে নেওয়া ঠিক হবে না। তেল পরিবহন, রাসায়নিক শিল্প ও পরিবহন খাতেও গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ আবার স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা যায় এবং বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া সম্ভব।

তবু এআই অর্থনীতিতে বিদ্যুতের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের এআই দৌড়ে শুধু কে সবচেয়ে শক্তিশালী মডেল বানালো, সেটিই প্রশ্ন হবে না। প্রশ্ন হবে, কে সেই মডেল চালানোর জন্য সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য, সস্তা ও পরিষ্কার বিদ্যুৎ দিতে পারল।

এআইয়ের নতুন জ্বালানি কি বিদ্যুৎ?

এআই যত বাড়ছে, তত বাড়ছে বিদ্যুতের প্রয়োজন। আইইএর হিসাবে, ২০২৪ সালে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো প্রায় ৪১৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। ২০৩০ সালে তা প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। ফলে এআই অর্থনীতির পরবর্তী বড় প্রতিযোগিতা হতে পারে বিদ্যুৎ নিয়ে। সৌর ও বায়ু শক্তির পাশাপাশি পারমাণবিক শক্তিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আর বড় চ্যালেঞ্জ হবে, এই বিপুল বিদ্যুৎ ডেটা সেন্টারে পৌঁছানোর মতো গ্রিড তৈরি করা।

ডেটা সেন্টার বদলে দিচ্ছে বিদ্যুৎ বাজার

ভাবুন, ভবিষ্যতে কোনো দেশের এআই ক্ষমতা নির্ভর করছে তার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর। যুক্তরাষ্ট্রে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৯ শতাংশ ডেটা সেন্টারে যেতে পারে বলে আইইএ পূর্বাভাস দিয়েছে। তাই এআই কোম্পানিগুলো শুধু চিপ আর ডেটা খুঁজছে না, খুঁজছে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎও। সৌর, পারমাণবিক শক্তি, ব্যাটারি এবং নতুন গ্রিড অবকাঠামো সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন এআই জ্বালানি অর্থনীতি। অর্থাৎ এআই বিপ্লবের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হতে পারে বিদ্যুৎ।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি