জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: নতুন পে-স্কেল কার্যকরের অপেক্ষা শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু, বেতন বিল দাখিল করতে গিয়ে যদি আটকে যায় হিসাবের চাকা, তাহলে কী হবে সরকারি কর্মচারীদের বেতনের? আইবাস++ সিস্টেমে বেতন নির্ধারণ, বিল দাখিলের প্রক্রিয়া আর পাওনা হিসাব—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। চলতি মাসের বেতন কি নতুন কাঠামো অনুযায়ী মিলবে? আর বকেয়া টাকাই বা কবে হাতে আসবে?
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বেতন বিল দাখিল নিয়ে উদ্বেগ আর বেতন পরিশোধ বন্ধ হয়ে যাওয়া এক কথা নয়। কোন প্রক্রিয়ায় সমস্যা হচ্ছে, আর নতুন পে-স্কেলের বাস্তবায়ন কত দূর এগিয়েছে, তা বুঝতে হলে দেখতে হবে পুরো হিসাবটা।
নতুন পে-স্কেল: সিদ্ধান্ত হয়েছে, এবার হিসাবের পালা
প্রথমেই স্পষ্ট করা দরকার, নতুন পে-স্কেল এখনো শুধু আলোচনার পর্যায়ে নেই। ২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করে সরকার। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় এ-সংক্রান্ত গেজেট। নতুন কাঠামো কার্যকর ধরা হয়েছে পহেলা জুলাই থেকে।
নতুন স্কেলে ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তবে, বেতন বৃদ্ধির পুরো সুবিধা একবারে দেওয়ার কথা নয়; ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদিত হওয়া এক বিষয়, আর প্রত্যেক কর্মচারীর ব্যক্তিগত বেতন হিসাব করে সেই অনুযায়ী টাকা পরিশোধ করা আরেক বিষয়।
আইবাস++ নিয়ে এত আলোচনা কেন?
এই পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে আইবাস++। এটি সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। সরকারি কর্মচারীদের নতুন মূল বেতন নির্ধারণের জন্য এই ব্যবস্থার পে-ফিক্সেশন মডিউল ব্যবহার করা হচ্ছে।
সহজ ভাষায়, একজন কর্মচারী কোন গ্রেডে আছেন, তার বর্তমান মূল বেতন কত, চাকরিতে যোগদানের তথ্য কী, পদোন্নতি বা উচ্চতর গ্রেডের কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাই করেই নির্ধারণ করতে হয় নতুন বেতন।
অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৫ অক্টোবর থেকে পে-ফিক্সেশনের কাজ শুরু হয় এবং ২০ অক্টোবরের মধ্যে তা শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা থাকলেই প্রত্যেক কর্মচারীর তথ্য যাচাই, ভুল সংশোধন এবং বেতন বিল দাখিলের সব ধাপ নির্বিঘ্নে শেষ হয়েছে—এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।
নতুন বেতনে কি মিলবে বকেয়াও?
সরকারি কর্মচারীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন নতুন বেতন কত হবে, আর আগের মাসগুলোর পাওনা কবে পাওয়া যাবে? অর্থ বিভাগের বরাত দিয়ে গত ৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন হলে অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে প্রায় তিন মাসের বকেয়া দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কার কত টাকা পাওনা হবে, তা নির্ভর করবে তার গ্রেড, আগের মূল বেতন, নতুন বেতন নির্ধারণ এবং প্রযোজ্য হিসাবের ওপর।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। নতুন পে-স্কেল মানেই সব ভাতা একই সঙ্গে বেড়ে যাওয়া নয়। ১৯ অক্টোবরের নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ভাতা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ৩০ জুনের মূল বেতনের ভিত্তিতে হিসাব করার কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, মূল বেতনে পরিবর্তন এলেও বাড়িভাড়া, চিকিৎসা বা অন্যান্য ভাতার ক্ষেত্রে একই সময়ে একই হারে পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তাই বেতন স্লিপে মূল বেতন, ভাতা ও বকেয়ার হিসাব আলাদা করে বুঝতে হবে।
বেতন বিল দাখিলে সমস্যা হলে কী প্রভাব পড়তে পারে?
এবার আসা যাক বেতন বিল দাখিল প্রসঙ্গে। সাধারণত সংশ্লিষ্ট দপ্তর কর্মচারীদের বেতনের হিসাব প্রস্তুত করে। এরপর প্রয়োজনীয় যাচাই ও অনুমোদনের ধাপ পেরিয়ে বিল দাখিল হয়। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে বিল তৈরির সফটওয়্যারে সমস্যা হলে, কর্মচারীর তথ্য অসম্পূর্ণ থাকলে কিংবা বেতন নির্ধারণের হিসাব চূড়ান্ত না হলে সংশ্লিষ্ট বিলের কাজ পিছিয়ে যেতে পারে। আর তাতে বেতন পাওয়ার সময়ও প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, কোনো কর্মচারী বিল জমা দিতে সমস্যায় পড়েছেন মানেই সব সরকারি দপ্তরের বেতন বিল বন্ধ, এমনটি নয়। একইভাবে বিল দাখিলে দেরি হলেই বেতন নিশ্চিতভাবে দেরিতে হবে, সেটিও বলা যায় না।
এ কারণেই সমস্যাটি ঠিক কোথায়, কতজন কর্মচারী এতে প্রভাবিত এবং বিকল্প ব্যবস্থায় বিল দাখিল করা যাচ্ছে কি না—এসব তথ্য জানা জরুরি।
এখন কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন?
পুরো পরিস্থিতি স্পষ্ট করতে এখন অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। প্রথমত, আইবাস++ এ বেতন বিল দাখিলের যে সমস্যার কথা বলা হচ্ছে, সেটি কি কারিগরি ত্রুটি, নাকি নতুন বেতন নির্ধারণের তথ্য যাচাই ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির সঙ্গে সম্পর্কিত?
দ্বিতীয়ত, যেসব কর্মচারীর পে-ফিক্সেশন সম্পন্ন হয়েছে, তাদের বেতন বিল দাখিল ও পরিশোধের অবস্থা কী?
আর তৃতীয়ত, কোনো দপ্তরে বিল দাখিলে সমস্যা হলে তা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী নির্দেশনা দিয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে অর্থ বিভাগ, হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কর্মচারীদের উদ্বেগ যেমন বাস্তব গুরুত্ব বহন করে, তেমনি বেতন বিল বন্ধ থাকা বা পরিশোধ পিছিয়ে যাওয়ার মতো দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্যও প্রয়োজন।
অপেক্ষা শুধু নতুন বেতনের নয়, স্বচ্ছ হিসাবেরও
নতুন পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। এখন সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক বেতন নির্ধারণ, নির্ভুল হিসাব এবং সময়মতো অর্থ পরিশোধ।
আইবাস++ নিয়ে কোনো জটিলতা থাকলে তার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। একই সঙ্গে, বেতন বিল দাখিলের সময়সূচি, বকেয়া পরিশোধ এবং ভাতার হিসাব নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলে তা দূর করাও জরুরি। কারণ, বেতন শুধু মাস শেষে পাওয়া একটি অর্থ নয়, এটিই লাখো পরিবারের মাসিক খরচ, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম ভরসা। এখন দেখার বিষয়, বেতন বিল দাখিল নিয়ে ওঠা উদ্বেগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং কর্মচারীরা নির্ধারিত সময়ে তাদের প্রাপ্য বেতন ও বকেয়া বুঝে পান কি না।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি