Print Date & Time : 28 October 2026 Wednesday 03:43 am

১০ পরিবারের ৭টির উদ্বেগ ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া

image

মো. মতিউর রহমান, ঢাকা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পড়ছে শিশু স্বাস্থ্যের ওপর। বিশেষ করে নগরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা জলবায়ুজনিত দুর্যোগে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে এসব এলাকায় ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া, চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। একটি মাঠ জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ পরিবারের ৭টি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াজনিত জ্বরকে স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে জানিয়েছে। 

এছাড়া ৬৯ শতাংশ পরিবার ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রধান স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ১৮ শতাংশ পরিবার চর্মরোগ, ১০ শতাংশ পানিবাহিত রোগ এবং ৩ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার শ্বাসতন্ত্রের রোগের কথা জানিয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এবং সাতক্ষীরা পৌরসভার ৯টি বস্তি এলাকায় এ জরিপ পরিচালনা করা হয়।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ফার্মগেটে দ্য ডেইলি স্টার ভবনে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে নগরের শিশু স্বাস্থ্য: সংকট ও সমস্যা সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক উপস্থাপনা ও নাগরিক সংলাপে জরিপে পাওয়া তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়। চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী শাহ ইসরাত আজমেরী।  

উপস্থাপনায় বলা হয়, জরিপে অংশ নেওয়া ৫১ দশমিক ৮৭ শতাংশ পরিবার তাপপ্রবাহকে সবচেয়ে বেশি অনুভূত জলবায়ুজনিত চাপ হিসেবে উল্লেখ করেছে। জলাবদ্ধতার কথা বলেছে ৩০ দশমিক ৪৮ শতাংশ পরিবার। এছাড়া নদীভাঙনের কথা বলেছে ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ এবং লবণাক্ততার কথা বলেছে শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ পরিবার।

জরিপে অংশ নেওয়া ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা তিনবারের বেশি জলবায়ুজনিত দুর্যোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। ১৮ দশমিক ৭২ শতাংশ পরিবার দুই থেকে তিনবার এবং ৮ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার একবার এমন দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। মাত্র ২ দশমিক ৬৭ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা এ ধরনের দুর্যোগের অভিজ্ঞতা পায়নি।

অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বাড়ছে ঝুঁকি
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার টিন ও বাঁশের তৈরি অস্থায়ী ঘরে বসবাস করে। ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার পানীয় জলের জন্য নলকূপ এবং ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ অন্য উৎসের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবারকে শৌচাগার ভাগাভাগি করে নিতে হয়। এসব শৌচাগারের ৮২ শতাংশই ১০ জনের বেশি মানুষ ব্যবহার করে।

উপস্থাপনায় বলা হয়, ঘনবসতিপূর্ণ ঘরবাড়ি, নিরাপদ পানির সীমিত প্রাপ্যতা এবং ভাগাভাগি করা শৌচাগার, তাপপ্রবাহ ও জলাবদ্ধতা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে শিশুরা দ্রুত পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হতে পারে। দূষিত পানি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ে। অসুস্থতার কারণে তাদের পুষ্টি ও পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সংলাপে এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন নিশ্চিত ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, মশা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি বস্তি এলাকায় তাপপ্রবাহ ও জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং দুর্যোগের আগাম প্রস্তুতি জোরদারের সুপারিশও করা হয়। 

সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, নগরায়ণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তন পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বায়ুদূষণ, তাপপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও সংক্রামক রোগের বিস্তার শিশুদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। তাই শুধু সমস্যা চিহ্নিত করলেই হবে না, দ্রুত বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, নাগরিক সংগঠন ও কমিউনিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নগর স্বাস্থ্যের প্রভাব নিয়ে আলোচনার পর কড়াইলের বস্তিতে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এক মাসের ব্যবধানে ওই বস্তিতে ৩০০ জনের বেশি গুরুতর প্রতিবন্ধী শিশু খুঁজে পাওয়া যায়। জলবায়ু পরিবর্তন ও নগর স্বাস্থ্যের ক্ষতিকর প্রভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও উপেক্ষিত বলে উল্লেখ করেন তিনি। 

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও পরিবেশ রক্ষায় দেশের সব হাসপাতালে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সরকারি নীতির কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রিভেনশন ও বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নীতিতে বিশ্বাসীদের দলমত ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

নাগরিক সংলাপে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বায়ুদূষণ বাড়লে শিশুরা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং নিউমোনিয়াসহ শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ধূলিকণা ও ক্ষতিকর কণা এবং তুলনামূলক দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কারণে শিশুরা বেশি সংবেদনশীল। মায়ের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে শিশুর স্বাস্থ্যও ঝুঁকিতে পড়ে।

তিনি বলেন, শুধু বড় হাসপাতাল বা যন্ত্রনির্ভর তৃতীয় স্তরের চিকিৎসার দিকে না ঝুঁকে প্রাথমিক, দ্বিতীয় ও তৃতীয়— সব স্তরের স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে হবে।

গ্রিন ভয়েসের সহপ্রতিষ্ঠাতা হুমায়ূন কবির সুমনের সঞ্চালনায় মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান খোকন, সেন্টার ফর সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড ক্লাইমেটের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ নূরনবী, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সয়েল, ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক সানউল ইসলামসহ অন্যরা সংলাপে অংশ নেন।