Print Date & Time : 26 October 2026 Monday 02:46 am

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তায় সশস্ত্র গোষ্ঠী, ভূরাজনীতি ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ

image

মো. ফজলুল হক: বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি জেলার সাজেকে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা পাহাড়ি অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ অঞ্চলে পর্যটক ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এবং কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)-এর নাম আলোচনায় এসেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক লক্ষ্য বিবেচনায় এ দুটি সংগঠনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির বিরোধিতার প্রেক্ষাপটে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইউপিডিএফ প্রতিষ্ঠিত হয়। সংগঠনটি পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে ধরে। অন্যদিকে নাথান বমের নেতৃত্বে গঠিত কেএনএফ কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে আলোচনায় এসেছে। সংগঠনটির সশস্ত্র তৎপরতা বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে দুই সংগঠনের রাজনৈতিক লক্ষ্য, সাংগঠনিক কাঠামো ও কার্যক্রমকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গেলে মিয়ানমারের সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির ভূমিকা এবং এ অঞ্চলের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে তার সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হয়। সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় নিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান সুদৃঢ় করা, প্রতিপক্ষের তৎপরতা মোকাবিলা এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রভাব বজায় রাখার স্বার্থ বিভিন্ন সশস্ত্র পক্ষের কৌশলগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য যোগাযোগ বা স্বার্থের মিল আঞ্চলিক পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। তবে ইউপিডিএফ ও কেএনএফকে আরাকান আর্মির প্রত্যক্ষ প্রক্সি বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে— এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও স্বাধীন অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে কয়েকটি পৃথক রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সমন্বিত প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। ইউপিডিএফের রাজনৈতিক লক্ষ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অধিকারকেন্দ্রিক; কেএনএফের দাবি কুকি-চিন জনগোষ্ঠীর পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সম্পর্কিত; আর আরাকান আর্মির কর্মকাণ্ড মূলত মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান সুদৃঢ় করার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিবেচ্য। এই পক্ষগুলোর মধ্যে সম্ভাব্য যোগাযোগ, পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা স্বার্থের সংঘাত বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা-ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের অসম সুযোগের মতো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সীমাবদ্ধতা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী বা বহিঃশক্তি যদি এসব বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তাহলে তা শুধু জাতীয় নিরাপত্তার জন্য নয়, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সরকার, সেনাবাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নিরাপত্তা রক্ষা ও সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সীমান্তে নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়, আন্তঃসংস্থাগত সহযোগিতা এবং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সীমান্ত সড়ক প্রকল্প যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

তবে শুধু নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ অঞ্চলের জন্য সমন্বিত, বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ, কর্মসংস্থান, কৃষি, পর্যটন, স্থানীয় অর্থনীতি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে এ পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে। 

একটি কার্যকর মাস্টারপ্ল্যানের মাধ্যমে নিরাপত্তা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে সমন্বিত করা গেলে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব বিস্তারের সুযোগও কমানো সম্ভব হতে পারে। স্থানীয় জনগণের জন্য বৈধ কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুযোগ বাড়লে সংঘাতের প্রতি আকর্ষণ কমানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সংকটকে শুধু সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে বিচার করলে সমস্যার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় জনগণের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ। তাই দৃঢ় নিরাপত্তাব্যবস্থা, কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং স্থানীয় জনগণের আস্থাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়াই হতে পারে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার কার্যকর পথ।

শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়