জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: ইউরোপের দক্ষিণ প্রান্তের শহর ‘জেলা’তে ঢুকে পড়া কৃষকের ট্রাক্টরগুলোয় উড়ছে সিসিলির পতাকা। পতাকায় রয়েছে মেডুসার প্রতীক, তিনটি বাঁকানো পা এবং গমের শীষ— যা প্রাচীন রোমান যুগ থেকে শস্যভান্ডার হিসেবে দ্বীপটির ভূমিকার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু কৃষকেরা এবার ফসল ঘরে তুলতে আসেননি। তারা এসেছেন বিক্ষোভে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ইউরোপজুড়ে জ্বালানির আকাশছোঁয়া দাম পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয় ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে চাপে ফেলছে, এতেই বাড়ছে জনঅসন্তোষ । আগামী বছর ফ্রান্স, ইতালি ও পোল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে নির্বাচন সামনে রেখে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগাচ্ছে কট্টর ডানপন্থি দলগুলো।
ফ্রান্সের গ্রামীণ গাড়িচালক থেকে শুরু করে সাবেক কমিউনিস্ট রাষ্ট্র পূর্ব জার্মানির তরুণেরাসহ অনেকেই বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজছেন। আর সেই সুযোগে আগে থেকেই জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছিল একসময় প্রান্তিক হিসেবে বিবেচিত কট্টর ডানপন্থি দলগুলো।
গত ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ জ্বালানির দাম তীব্রভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে সরকারগুলোর সংকট আরও গভীর হয়েছে। জনঅসন্তোষ এখন রাজপথে ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও আগে থেকেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং সরকারি ব্যয় কমানোর চাপ ছিল ইউরোপজুড়ে।
ফ্রান্সে প্যারিসের উত্তরাঞ্চলীয় উপশহরগুলোর স্কুলগুলোয় শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কয়েক দশকের মধ্যে দেশটির অন্যতম ভয়াবহ অস্থিরতায় রূপ নিয়েছে। দোকানপাট লুট হয়েছে, ভবনে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং লিমোজ শহরের ১৯ শতকের একটি পৌরসভা ভবনেও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
নঁতে শহরের ২১ বছর বয়সি বিক্ষোভকারী কুয়েন্তাঁ লেভিলু বলেন, ‘আমি এখানে কেন এসেছি? খুব সহজ কথা, জীবনযাত্রার বর্তমান ব্যয় আমাকে সত্যিই আতঙ্কিত করে তুলেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যারা ন্যূনতম মজুরিতে কোনোমতে জীবন চালান, তাদের কথা ভাবুন। খাবার, জ্বালানি এবং অন্যান্য সবকিছুর দাম দেখুন। জিনিসপত্র যে অবিশ্বাস্য রকমের ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে, তা সত্যিই ভয়াবহ।’
ইউরোপীয় কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের কারণে বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় ইউরোপের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো (১১২ বিলিয়ন ডলার)। গ্যাসের দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেড়েছে এবং ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সপ্তাহান্তে দেওয়া এক ভাষণে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের ‘ন্যায্য দাবিগুলো’ স্বীকার করেন। তবে সহিংসতা ও লুটপাটের জন্য দায়ীদের নিন্দা জানান তিনি।
মাখোঁ বলেন, ‘আমাদের কখনই তাদের সঙ্গে সেই ব্যক্তিদের এক করে দেখা উচিত নয়, যারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, ভাঙচুর করেছে এবং লুটপাট করেছে।’
ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বিক্ষোভ
ইউরোপের অন্যান্য স্থানেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ইতালির সমৃদ্ধ উত্তরাঞ্চলীয় শহর মিলানে রোববার নিম্নমানের সরকারি পরিষেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুড়েছেন এবং দোকানপাট লুট করেছেন।
সিসিলির দক্ষিণ উপকূলীয় শহর জেলায় কৃষকেরা বলছেন, জ্বালানির ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে কৃষিযন্ত্র চালানো এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমরা জমি চাষ করি, আর ঋণের ফসল ঘরে তুলি।’
ক্যালতানিসেত্তা প্রদেশের কৃষক প্রতিনিধিদের একজন আরকাঞ্জেলো গামবিনো বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছি। জ্বালানির খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।’
ট্রাকচালক, কৃষক ও ইস্পাত শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ দক্ষিণ ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটিয়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে জ্বালানির সংকট দেখা দিয়েছে এবং সুপারমার্কেটগুলোতে পণ্য সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত শনিবার লিসবনের রাস্তায় কয়েক হাজার মানুষ মিছিল করেছেন। তাদের ক্ষোভের কারণ কম মজুরি, আবাসন ব্যয় এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ। এতে পর্তুগালের মধ্য-ডানপন্থি সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে।
স্পেনে ৮৭ বছর বয়সি এক নারীকে তার বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা দেশজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। আবাসন সংকট ও আকাশছোঁয়া ভাড়া নিয়ে অসন্তোষের মধ্যে এই ঘটনা আগামী মাসে আগাম নির্বাচন আয়োজনের অন্যতম অনুঘটক হয়ে উঠেছে। বেলজিয়ামেও বিক্ষোভ হয়েছে। অন্যদিকে আলবেনিয়ায় বড় বড় সমাবেশের পেছনে রয়েছে সরকারি দুর্নীতি নিয়ে অসন্তোষ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং শিক্ষার নিম্নমান। এই বিক্ষোভগুলো ইউরোপজুড়ে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক উদ্বেগের প্রতিফলন, যা ক্রমেই রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করছে।
সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জিল ইভালদি বলেন, ইউরোপজুড়ে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ।
উগ্র ডানপন্থি ও উগ্র বামপন্থি— উভয় ধারার রাজনীতিকেরাই ক্রমবর্ধমানভাবে যুক্তি দিচ্ছেন যে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্যের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলে খরচ কমানো সম্ভব হবে। ফলে ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক ঐকমত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।