Print Date & Time : 22 October 2026 Thursday 05:42 am

আমাদের সড়কগুলো কবে নিরাপদ হবে?

image

এ বি এম সিয়াম আহমেদ : বার্ষিক পরীক্ষার ছুটিতে পাবনার গ্রামের বাড়ি থেকে মা-বাবার কাছে বেড়াতে এসেছিল ১১ বছরের তাওহিদ। কিন্তু সেই বেড়ানোই যে তার জীবনের শেষ যাত্রা হবে; তা কি তার পরিবার কখনও ভেবেছিল? ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভারের গেণ্ডা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় শিশুটি। ঢাকার ধামরাইয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কয়েকজন যাত্রী। যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতায় সেলফি পরিবহনের দুটি বাসের রেষারেষির একপর্যায়ে একটি বাস উঠে যায় অপেক্ষমাণ যাত্রীদের ওপর। প্রাণ হারান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও ৪১তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত রুবেল পারভেজসহ দুজন। মঙ্গলবার সকালে এই লেখাটি লেখার সময়ই খবর এলো নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও বালুবাহী ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে বহু মানুষের প্রাণহানির। প্রাথমিক খবরে নিহতের সংখ্যা ১৪ বলা হলেও পরবর্তী প্রতিবেদনে এ সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য এসেছে। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অনেকে। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, প্রিয়জন হারানোর বেদনা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। 

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ৮ বছরেও সড়ক নিরাপদ হয়নি। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে একটি বাসের চাপায় শহিদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর ঢাকাসহ সারা দেশের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে নজিরবিহীন আন্দোলন গড়ে তোলে। সে সময় কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে যানবাহনের কাগজপত্র ও চালকদের লাইসেন্স পরীক্ষা করে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সড়ক ব্যবস্থাপনায় কতটা বিশৃঙ্খলা জমেছে। আন্দোলনের মুখে সরকার সড়ক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়। পরে প্রণয়ন করা হয় নতুন সড়ক পরিবহন আইন। বাড়ানো হয় শাস্তি, জোর দেওয়া হয় চালকদের দক্ষতা, লাইসেন্স ও যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করার ওপর। বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্ন কিছু বিশেষ অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও তদারকির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু আট বছর পর প্রশ্ন উঠেছে— এসব উদ্যোগের ফল কোথায়? সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৭ হাজার ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী। একই সময়ে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহত হয়েছে ৪৮ হাজার ৭১৩ জন। 

সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন আর কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, এটি একটি বৈশ্বিক অগ্রাধিকার। জাতিসংঘ ২০২১ থেকে ২০৩০ সালকে সড়ক নিরাপত্তার দ্বিতীয় দশক ঘোষণা করেছে। বিশ্বসংস্থার ‘ডিকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি’-এর মূল লক্ষ্য হলো এই দশকের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনা। বাংলাদেশও এই লক্ষ্য অর্জনের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। সর্বশেষ গত ২০ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সভায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন  আমাদের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী।

দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা ও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রাণহানি কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই মহাসড়কে জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা, ২৪ ঘণ্টা অ্যাম্বুলেন্স সেবা এবং নিকটস্থ হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। সেইসঙ্গে প্রতিটি দুর্ঘটনার সঠিক তথ্য সংরক্ষণ, ঘটনার মূল কারণ বিশ্লেষণ এবং সে অনুযায়ী ভবিষ্যৎ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, পরিবহন মালিক, চালক ও সাধারণ নাগরিকসহ সবার। তবে যাদের হাতে নীতিনির্ধারণ ও আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে তাদের দায়িত্ব নিশ্চিতভাবেই সবচেয়ে বেশি।

এবারের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য— ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।’ উন্নয়নের আসল অর্থ হলো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যে সড়কে একটা শিশু নিরাপদে স্কুলে যেতে পারে না, একজন খেটে খাওয়া মানুষ কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পথে প্রাণ হারান, বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রী পিষে যান চাকার তলায় কিংবা রাস্তা পার হতে গিয়ে পথচারী মারা যান— সেই সড়ক ব্যবস্থাকে কীভাবে আমরা উন্নত বলব? 

শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতে হলে সড়কে তাদের জীবন রক্ষাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার, উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা দিবসভিত্তিক প্রতিশ্রুতির বাইরে গিয়ে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাস্তব অগ্রগতি কতটা হয় সেটিই হবে সরকারের উদ্যোগের প্রকৃত পরীক্ষা। 

শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ