Print Date & Time : 21 October 2026 Wednesday 01:14 pm

বিশ্বে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা

image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধ, জ্বালানির উচ্চমূল্য, সার রপ্তানিতে বিঘ্ন এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতাও বাড়তে পারে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার কেন্দ্রীয় এলাকায় পার্কিংয়ের দায়িত্বে থাকা ৬৩ বছর বয়সি মুহাম্মদ ইয়াসিন বলেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি খাবার খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। আগে ৭ থেকে ৮ হাজার রুপিয়ায় চাল, টেম্পে ও টোফু কিনতে পারতেন তিনি। এখন একই খাবার কিনতে খরচ হচ্ছে ১৫ হাজার রুপিয়া। সপ্তাহে ২ লাখ থেকে ৩ লাখ রুপিয়া আয় করেন ইয়াসিন।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিশ্লেষণ করা ১৫০টি দেশের মধ্যে ২২ শতাংশ দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি ছিল। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ।

আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেন হওয়া বিভিন্ন পণ্যের মাসিক দামের পরিবর্তন পরিমাপ করে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। সংস্থাটির খাদ্যমূল্য সূচক গত সেপ্টেম্বরে গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে উঠেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ।
খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলে সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কা বাড়ে। একইসঙ্গে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, যা সংকটকে আরও গভীর করবে।

একাধিক দিক থেকে সরবরাহে ধাক্কা: কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে শস্য অবকাঠামোয় হামলার কারণে গম পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। এতে মিসর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে গম সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, লোহিত সাগরে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে চলাচল করতে হচ্ছে। ইরানের যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় কৃষি খাতের উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। এর মধ্যে এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়া ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।

২০২৬ সালে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বড় মজুত থাকা সত্ত্বেও এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দাম যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল, সেখান থেকে কিছুটা কমলেও এখনও তা অনেক বেশি।

নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেন, পণ্য উৎপাদনের উপকরণের বাড়তি দাম পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি ও যুদ্ধজনিত বাড়তি ঝুঁকির কারণে কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।

মিসরে ভর্তুকিবিহীন বড় একেকটি রুটির দাম ৪ মিসরীয় পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় ৫ পাউন্ড হয়েছে। কায়রোর কেন্দ্রস্থলে বেকারি পরিচালনা করেন সায়েদ আবদেল হামিদ মোহাম্মদ। তিনি বলেন, শুধু ময়দার দামই বাড়েনি। দক্ষ শ্রমিক নিয়োগের খরচও অনেক বেশি। বিদ্যুৎ, পানি, ইস্ট এবং রুটি তৈরির অন্যান্য উপকরণের দামও বেড়েছে। ওই বেকারির ক্রেতা তারেক আজাব বলেন, গত কয়েক বছর ধরে পণ্যের দাম নিয়মিত বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও এ বছর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ।

ভারতে উৎপাদন ঘাটতির কারণে সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা: ২০২৫ সালের শেষের দিক থেকে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এখন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে শুরু করায় মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি বড় আমদানিকারক দেশ স্থানীয়ভাবে ভালো ফসল উৎপাদনের কারণে এতদিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনাকাটা কমিয়ে রেখেছিল। এখন তাদের আবার বিশ্ববাজারে ফিরতে হচ্ছে। এতে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।

লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেকজান্ডার কারাভাইতসেভ বলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারকরা বাজারে ফিরলে চাহিদার নতুন ও উল্লেখযোগ্য ঢেউ দেখা দিতে পারে।

এফএওর কর্মকর্তা তোরেরো বলেন, বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুতের কারণে এতদিন সরবরাহে কিছুটা সুরক্ষা ছিল। তবে সেই সুরক্ষা কমে আসছে। আগের মৌসুমগুলোর ভালো ফলন ও মজুদ বাজারকে সামাল দিতে সাহায্য করেছে, কিন্তু এখন সেই মজুদের ওপর চাপ বাড়ছে। ফলে কৃষিপণ্যের দাম আরও দ্রুত বাড়তে পারে।