জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ল্যাপটপ ক্যামেরার পাশের নির্দেশক এলইডি লাইটটি সবসময় হার্ডওয়্যার স্তরে সুরক্ষিত থাকে না। প্রস্তুতকারকদের দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও বাস্তবে অধিকাংশ ওয়েবক্যাম এবং এর ইন্ডিকেটর লাইট পরিচালনা করে একটি মাইক্রোকন্ট্রোলার চিপ।
ল্যাপটপ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো বহু বছর ধরে দাবি করে আসছে, তাদের ওয়েবক্যামের নিরাপত্তা লাইটটি এমনভাবে ডিজাইন করা যে ক্যামেরা লেন্সে কারেন্ট গেলেই এলইডি লাইটও জ্বলবে। কিন্তু আধুনিক টেকনিশিয়ান এবং সাইবার সিকিউরিটি রিসার্চারদের সাম্প্রতিক গভীরে চালানো অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চরম এক সত্য। বাস্তবে ল্যাপটপের লেন্স আর ইন্ডিকেটর লাইট সবসময় সরাসরি হার্ডওয়্যার সার্কিটে যুক্ত থাকে না; বরং তাদের পরিচালনা করে একটি মাইক্রোকন্ট্রোলার শিপ।
এই সিস্টেমের মূল দুর্বলতা লুকিয়ে আছে সেই চিপের ভেতরকার 'ফার্মওয়্যার'-এ। সাইবার অপরাধীরা যখন কোনো সিস্টেমে 'রুটকিট' ম্যালওয়্যার পে পৌঁছে দেয়, তখন তারা অপারেটিং সিস্টেমকে বাইপাস করে সরাসরি ল্যাপটপের 'ইউএসবি ভিডিও ক্লাসের'
ওয়েবক্যাম কন্ট্রোলার চিপে অ্যাক্সেস পেয়ে যায়। চিপের ফ্ল্যাশ মেমোরিতে থাকা নির্দেশনাগুলোকে তারা রি-রাইট বা পরিবর্তন করে দেয়। এর ফলে চিপটি ক্যামেরার ইমেজ সেন্সরকে চালু করার নির্দেশ ঠিকই পাঠায়, কিন্তু ইন্ডিকেটর এলইডিতে সিগন্যাল পাঠানো বন্ধ করে দেয়।
সার্কিটের এই নীরব বাইপাসিং প্রক্রিয়াটি এতটাই সুক্ষ্ম যে আপনার কম্পিউটারের অ্যান্টিভাইরাসও এটি টের পায় না। কারণ অ্যান্টিভাইরাস সাধারণত সফ্টওয়্যার ও অপারেটিং সিস্টেম স্তরে নজরদারি চালায়, কিন্তু এই আক্রমণটি ঘটে সরাসরি চিপসেট ও হার্ডওয়্যার ড্রাইভার লেভেলে। ফলস্বরূপ, আপনি অফিসে বা ঘরে ল্যাপটপ খুলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন বা ব্যক্তিগত সময় কাটাচ্ছেন, অন্যদিকে হাজার মাইল দূর থেকে হ্যাকাররা পুরোপুরি স্বাভাবিক লাইট-অফ অবস্থায় আপনার ক্যামেরা দিয়ে প্রতিটি ফ্রেম স্ন্যাপ করছে।
সাইবার ক্রাইমের বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডার্ক ওয়েব ফোরামগুলোতে এখন এমন প্রাক-তৈরি 'ফার্মওয়্যার ফ্ল্যাশার রুটকিট' বিক্রি হচ্ছে। এগুলো ব্যাকগ্রাউন্ডে চুপচাপ কাজ করে এবং কেবল এলইডি লাইটই অফ রাখে না, বরং ভিডিও ডাটাগুলোকে এনক্রিপ্ট করে পাঠায় যাতে নেটওয়ার্ক মনিটর কোনো অস্বাভাবিক ফাইল ট্রান্সফার শনাক্ত করতে না পারে। অর্থাৎ আপনার ইন্টারনেট ব্যাকগ্রাউন্ডেই নিঃশব্দে পাচার হচ্ছে আপনার প্রাইভেট স্পেসের দৃশ্য।
হার্ডওয়্যার এনক্রিপশনের এই মারাত্মক বাইপাস এড়াতে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা কী হতে পারে?
প্রথমত, প্রযুক্তির ওপর 'ফলস সেন্স অফ সিকিউরিটি' বা ভুয়া নিরাপত্তাবোধ রাখা বন্ধ করুন। আপনার ল্যাপটপের লেন্সের ওপর একটি ফিজিক্যাল স্লাইডার বা ওয়েবক্যাম কভার ব্যবহার করাই একমাত্র ১০০% বিশ্বস্ত পদ্ধতি।
দ্বিতীয়ত, আপনার ল্যাপটপের অফিশিয়াল ব্র্যান্ড ওয়েবসাইট ছাড়া অন্য কোনো আন-ট্রাস্টেড সোর্স থেকে বায়োস বা ড্রাইভার আপডেট ইনস্টল করবেন না।
তৃতীয়ত, অপ্রয়োজনীয় সময় ডায়াগনস্টিক বা ট্রাবলশুটিং সাইট থেকে ল্যাপটপ রিমোট এক্সেস পারমিশন দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
এবং চতুর্থত, নিয়মিতভাবে ল্যাপটপের ডিভাইস ম্যানেজারে গিয়ে অব্যবহৃত সময় ক্যামেরা ড্রাইভারটি 'ডিজেবল' করে রাখতে পারেন।
প্রযুক্তির নিরাপত্তা ব্যবস্থা যত উন্নত হচ্ছে, অপরাধীদের বাইপাস করার কৌশলও তত সূক্ষ্ম হচ্ছে। একটি ছোট লাইট জ্বলেনি বলেই আপনি নিরাপদ-এই ধারণা এখন অতীত। আজই নিজের ল্যাপটপের লেন্স ঢেকে রাখুন এবং যেকোনো ধরনের সাইবার নজরদারি থেকে নিজেকে মুক্ত রাখুন।
যেভাবে বাইপাস হচ্ছে ল্যাপটপ ক্যামেরার নিরাপত্তা লাইট
ভাবছেন ল্যাপটপের ওয়েবক্যামে সিকিউরিটি লাইট জ্বলছে না মানে কেউ আপনাকে দেখছে না? এই ভুল ধারনাই হ্যাকারদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র! ক্যামেরা চিপের ফার্মওয়্যার হ্যাক করে খুব সহজেই নিরাপত্তা লাইটের সার্কিট বাইপাস করা যায়। এতে আলো না জ্বলেই আপনার গোপন মুহূর্ত লাইভ রেকর্ড হয়ে যায় অপরাধীদের ডার্ক ওয়েব সার্ভারে! প্রযুক্তির এই হার্ডওয়্যার বাইপাস থেকে বাঁচতে আজই ল্যাপটপ ক্যামেরায় স্লাইডার কভার ব্যবহার করুন। সচেতনতা বাড়াতে ভিডিওটি শেয়ার করুন!
—জা. অর্থনীতি/এলএটি