Print Date & Time : 16 October 2026 Friday 06:50 am

ঋতু পরিবর্তনে বাড়ছে জ্বর-সর্দি ও নিউমোনিয়া, হাসপাতালে রোগীর ভিড়

image

যশোর প্রতিনিধি: ঋতু পরিবর্তনের প্রভাবে যশোরে বাড়ছে জ্বর, সর্দি-কাশি, বমি ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন মৌসুমি রোগের প্রকোপ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা।

এদিকে রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। শিশু ওয়ার্ডে ২৪টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ১২৬ শিশু। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক শিশুকে থাকতে হচ্ছে ওয়ার্ডের মেঝেতে। নবজাতক বিভাগসহ হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডেও দেখা দিয়েছে অতিরিক্ত রোগীর চাপ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আবহাওয়ার পরিবর্তনজনিত অসুস্থতা নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৪০ জন রোগী প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে গতকাল বুধবার সকাল ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত শিশু বহির্বিভাগের ১১৩ ও ১১৪ নম্বর কক্ষে চিকিৎসা নিয়েছে ২২৩ শিশু। একই সময়ে পুরুষ বহির্বিভাগে ৬২ জন এবং মহিলা বহির্বিভাগে ৫৫ জন সেবা নিয়েছেন। এছাড়া ঠাণ্ডাজনিত তীব্র সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৬১ জন। তাদের মধ্যে ১২৬ শিশু, ১২ পুরুষ ও ২৩ নারী রয়েছেন।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ বেশি শিশু চিকিৎসাধীন। ২৪টি শয্যার বিপরীতে ১২৬ শিশু ভর্তি থাকায় অধিকাংশকেই মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। নবজাতক বিভাগেও একই পরিস্থিতি। সেখানে ১০টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ২৬ নবজাতক। পুরুষ ও মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডেও রোগীর চাপ সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

হাসপাতালের এই চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে অসুস্থ শিশুদের স্বজনদের।

যশোর সদর উপজেলার নূরপুর গ্রামের জ্যোৎস্না বেগমের দুই বছরের সন্তান রেজাউলের ১২ অক্টোবর থেকে প্রচণ্ড জ্বর, বমি ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নিয়েও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় বুধবার শিশুটিকে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন তিনি।

রেজাউলের মতো একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিচ্ছে ৩ মাস বয়সী আব্দুল্লাহ, ৩ বছরের আয়েশা, ১৬ মাস বয়সী ফারজানাসহ আরও অনেক শিশু। শয্যা না পেয়ে তাদের কারও ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগে দিন কাটছে অভিভাবকদের।

বড়দের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে মৌসুমি অসুস্থতা। যশোরের মালঞ্চি গ্রামের নজরুল ইসলাম জানান, গত রোববার থেকে তিনি প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছিলেন। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল খেয়েও সুস্থ না হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একইভাবে জ্বর, বমি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সদর উপজেলার শেখহাটি বাবলাতলা এলাকার সিরাতুন মুনিরা। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁরা কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন।

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ সেবিকা জেসমিন খাতুন বলেন, ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ২৪টি, অথচ ভর্তি শিশু ১২৬ জন। অতিরিক্ত রোগীদের মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তবে বর্তমানে শিশুদের ওষুধের কোনো সংকট নেই বলে জানান তিনি।

হাসপাতালের নার্সিং তত্ত্বাবধায়ক রহিমা আক্তার বলেন, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ছয় শতাধিক রোগী অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন ভাইরাসজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীও রয়েছেন। সীমিত জনবল নিয়ে সেবিকারা রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুস সামাদ বলেন, ঋতু পরিবর্তনের সময় শিশুদের মধ্যে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে। আবহাওয়ার শুষ্কতা, ধুলাবালি, পরাগরেণু ও আর্দ্রতার পরিবর্তনে অ্যালার্জি, ত্বকে র‌্যাশ এবং হাঁপানির সমস্যা বাড়তে পারে। পাশাপাশি ডায়রিয়া, জন্ডিস, খাদ্যে বিষক্রিয়া ও পাকস্থলীর নানা সমস্যাও দেখা যায়।

তিনি আরও বলেন, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে যশোরের কেশবপুর ও মণিরামপুর এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক।

শিশুদের যত্নে অভিভাবকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, জ্বর হলে শিশুর শরীর আরামদায়ক রাখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া কোনো ওষুধ খাওয়ানো উচিত নয়। বমি বা খাবারে অরুচি দেখা দিলে শিশুকে পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। প্রয়োজনে খাবার স্যালাইনসহ উপযুক্ত তরল গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

যশোর মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবু হায়দার মনিরুজ্জামান বলেন, ঋতু পরিবর্তনের সময় বড়রাও ভাইরাসজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছেন। বয়স্ক ব্যক্তি এবং উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে অসুস্থতা জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাই বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হুসাইন শাফায়াত বলেন, আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে চাপ তৈরি হয়েছে। সীমিত শয্যা ও জনবল নিয়েই রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীদের প্রয়োজনে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ওষুধ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সার্বক্ষণিক নজরদারি চলছে।

তিনি সাধারণ জ্বর-সর্দিতে আতঙ্কিত না হয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সব মিলিয়ে, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে যশোরে মৌসুমি রোগের বিস্তার হাসপাতালের বিদ্যমান শয্যা ও জনবলের সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। বিশেষ করে শিশু ও নবজাতকদের চিকিৎসায় অতিরিক্ত চাপ পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

—জা. অর্থনীতি/এনজে