Print Date & Time : 08 November 2026 Sunday 03:20 pm

পান্ডা কেন কেবল চীনের পাহাড়েই বন্দি? (ভিডিও)

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি বনের ভেতর দিয়ে নীরবে হেঁটে চলে কালো-সাদা এক প্রাণী। চারপাশে শুধু বাঁশের মৃদু শব্দ। এই শান্ত পরিবেশেই জন্ম নেয় পৃথিবীর অন্যতম বিরল স্তন্যপায়ী পান্ডা। আর এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে চীনের ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

একসময় যে প্রাণীটি ছিল বিলুপ্তির প্রান্তসীমায়, আজ তাকে ফিরিয়ে আনার পেছনে কাজ করেছে বিজ্ঞান, মানুষের ভালোবাসা ও দীর্ঘ সংগ্রাম। বিশ্বজুড়ে এত বন আর পাহাড় থাকা সত্ত্বেও কেন পান্ডার স্বাভাবিক বিচরণ শুধু চীনেই সীমাবদ্ধ?

প্রাপ্তিস্থান ও শারীরিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ভালুক পরিবারের এই সদস্যটি মূলত দুই প্রকার। বৃহৎ আকৃতির সাদা-কালো জায়ান্ট পান্ডা, যা কেবল চীনেই দেখা যায়। আর আকারে ছোট, বাদামি রঙের রেড পান্ডা, যার বিচরণ নেপাল, ভারত, ভুটান ও মিয়ানমারেও রয়েছে। একটি পূর্ণবয়স্ক জায়ান্ট পান্ডার ওজন ১৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। অথচ এদের নবজাতক শাবকটি জন্মায় মাত্র একটি ভুট্টার মোচার মতো ক্ষুদ্র আকারে।

পরিপাকতন্ত্র মাংসাশীর মতো হলেও বিবর্তনের ফলে এরা প্রায় পুরোপুরি বাঁশনির্ভর হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন একেকটি পান্ডাকে ১২ থেকে ৩৮ কেজি পর্যন্ত বাঁশ খেতে হয়। দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা খাবার খেয়ে এরা গড়ে ৫০ বার মলত্যাগ করে। কামড়ের ছাপ ও মলে থাকা অপাচ্য অংশ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বন্য পান্ডার উপস্থিতি শনাক্ত করেন। ২০১৪ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বনে বাস করা জায়ান্ট পান্ডার সংখ্যা ১ হাজার ৮৬৪টি।

পান্ডা প্রাকৃতিকভাবে শুধু চীনেই টিকে থাকার মূল কারণ হাজার বছরের পরিবেশগত পরিবর্তন। সংকুচিত হতে হতে এদের আবাসস্থল এখন মূলত চীনের সিচুয়ান, শানশি ও গানসু প্রদেশের প্রায় ২০টি বিচ্ছিন্ন বাঁশবনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বাঁশের চরম প্রাচুর্য এবং ঠান্ডা পাহাড়ি জলবায়ু কেবল এখানেই বিদ্যমান। চীনের সরকার ৬৭টি সংরক্ষিত এলাকা ও বিশেষ 'বাঁশ করিডোর' তৈরি করে এদের বংশবৃদ্ধিতে সহায়তা করছে।

১৮৬৯ সালে পশ্চিমা বিশ্বে পরিচিতি পাওয়া এই প্রাণীটিকে রক্ষা করতে ১৯৪৬ সালে চীন বিদেশে পান্ডা পাঠানো নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে শুরু হয় বিখ্যাত ‘পান্ডা ডিপ্লোম্যাসি’। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাণিজ্যিক চুক্তি জোরদারে বিভিন্ন দেশকে পান্ডা ধার দেওয়া শুরু হয়। তবে আশির দশকের আইন অনুযায়ী, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা জায়ান্ট পান্ডা ও তার শাবকের একক মালিক কেবল চীন।

প্রতি বছর জোড়া প্রতি প্রায় ১০ লাখ ডলার ফি এবং কঠোর শর্ত মেনে তবেই বিদেশি চিড়িয়াখানাগুলো চীনা সরকারের কাছ থেকে পান্ডা ধার নিতে পারে। প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও আধুনিক কূটনীতির নিখুঁত মেলবন্ধনেই আজ বিলুপ্তির হাত থেকে বেঁচে কেবল চীনেই রাজত্ব করে চলেছে জায়ান্ট পান্ডা।

চিড়িয়াখানার এই মিষ্টি পান্ডাগুলোর আসল মালিক আসলে কে জানেন?

আপনি কি জানেন, পৃথিবীর যেকোনো চিড়িয়াখানায় দেখা পান্ডাগুলোর একটিও কিন্তু সেই দেশের নিজস্ব সম্পত্তি নয়? শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, গোটা বিশ্বের প্রতিটি জায়ান্ট পান্ডা এবং বিদেশে জন্ম নেওয়া তাদের শাবকের আইনি মালিক কেবল চীন সরকার। ১৯৬০-এর দশক থেকে চীন ‘পান্ডা ডিপ্লোম্যাসি’ পরিচালনা করে আসছে। কোনো দেশের সাথে বড় বাণিজ্যিক চুক্তি হলে বছরে প্রায় ১০ লাখ ডলারের বিনিময়ে ১০ বছরের জন্য পান্ডা ধার দেয় তারা। ফলে বিদেশে থাকা প্রতিটি পান্ডাই মূলত চীনের রাষ্ট্রীয় আমানত।

দিনে ৫০ বার মলত্যাগ করা প্রাণীটির বিলুপ্তি কীভাবে ঠেকালো চীন?

একটি জায়ান্ট পান্ডা দিনে ১২ ঘণ্টা ধরে প্রায় ৩৮ কেজি পর্যন্ত বাঁশ খায় এবং দিনে অন্তত ৫০ বার মলত্যাগ করে! বাঁশের ওপর চরম নির্ভরশীলতার কারণে একসময় বিলুপ্তির দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল এই অদ্ভুত প্রাণীটি। তবে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে চীন সরকার গড়ে তোলে ৬৭টি বিশেষ সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং পাহাড়ি করিডোর। বনের গভীরে গিয়ে পান্ডার মল ও কামড়ের ছাপ বিশ্লেষণ করে গবেষকরা সংখ্যা গুনেছেন। এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০১৪ সালে বনে বন্য পান্ডার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৬৪টিতে।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি