Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 11:44 pm

ডিসকাউন্টে কিনে আসলে কত টাকা বাঁচাচ্ছেন?

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

দুহাজার টাকার পণ্য এক হাজারে! মানে এক হাজার টাকা বাঁচালেন? এক মিনিট! আপনি যদি জিনিসটাই না কিনতেন, তাহলে কি এক হাজার টাকা বাঁচত না?

‘৫০ শতাংশ ছাড়’, ‘একটি কিনলে একটি ফ্রি’‘শেষ কয়েক ঘণ্টা’-এসব অফার কি সত্যিই আপনার টাকা বাঁচাচ্ছে, নাকি আপনাকে আরও টাকা খরচ করাচ্ছে?

আজকের হিসাবটা তাই ডিসকাউন্টের নয়। হিসাবটা হলো-আপনি কত টাকা বাঁচালেন, আর কত টাকা খরচ করার জন্য ‘সাশ্রয়’-এর গল্পটা বিশ্বাস করলেন।

ডিসকাউন্ট দেখলেই আমাদের প্রথম চিন্তা হয়-কত টাকা কমলো। কিন্তু ব্যক্তিগত অর্থনীতির আসল প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। কম দামে কিনলাম, নাকি এমন কিছু কিনলাম যেটা আমার আসলে দরকারই ছিল না?

ছাড়ের অঙ্ক বনাম আসল সাশ্রয়

ধরুন, একটি পণ্যের দাম দু হাজার টাকা। ৩০ শতাংশ ডিসকাউন্টে সেটি এখন এক হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ কাগজে-কলমে সাশ্রয়-৬০০ টাকা। কিন্তু এখানেই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে যায়। পণ্যটি যদি আপনার প্রয়োজনই না হয়, তাহলে ৬০০ টাকা সাশ্রয় হলো কোথায়? আপনার পকেট থেকে কিন্তু বের হয়েছে পুরো এক হাজার ৪০০ টাকা।

‘আগের দাম’ দেখে বিভ্রান্তি

ডিসকাউন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো, আগের দাম। পাঁচ হাজার টাকা থেকে ৫০ শতাংশ কমে দুহাজার ৫০০! দেখতে বিশাল সাশ্রয়। কিন্তু বাজারে একই পণ্য যদি দুহাজার ৪৫০ টাকাতেও পাওয়া যায়? তাহলে পাঁচ হাজার টাকা থেকে আপনি আড়াই হাজার টাকা বাঁচাননি। বাজারদরের তুলনায় সাশ্রয় মাত্র ৫০ টাকা। তাই ডিসকাউন্টের শতাংশ নয়-ডিসকাউন্টের পরের দামটা বাজারে কত, সেটাই আসল।

মূল্যস্ফীতির সময়ে ছাড় কেন এত আকর্ষণীয়?

এই গল্পটা শুধু শপিং মলের নয়। কারণ, মূল্যস্ফীতির সময়ে মানুষের হাতে থাকা টাকার ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ পড়ে। বাংলাদেশে জুলাই ২০২৬-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।

এ কারণে, ১০০ টাকার পণ্য ৯০ টাকায় পাওয়া গেলে স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়-সুযোগটা নেওয়া উচিত। কিন্তু এখানেই ঝুঁকি। দাম কম দেখে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কেনাকাটা।

“আরেকটা নিলে ছাড় বেশি”

ধরুন, আপনার দরকার একটি টি-শার্ট। দাম ৭০০ টাকা। কিন্তু অফার-তিনটি নিলে এক হাজার ৮০০ টাকা!

এখন মনে হলো-“আর দুটো নিলে তো ডিসকাউন্ট পাচ্ছি!” কিন্তু হিসাবটা কী বলছে? আপনি ৭০০ টাকা খরচ করার জায়গায় খরচ করলেন এক হাজার ৮০০ টাকা। প্রতি পণ্যের দাম কমেছে ঠিকই-কিন্তু আপনার মোট খরচ বেড়েছে এক হাজার ১০০ টাকা।

এবার আসি সবচেয়ে জনপ্রিয় অফারে-Buy 1 Get 1 Free! একটি পণ্যের দাম ৫০০ টাকা। দুটি পণ্য পেলেন ৫০০ টাকায়। দ্বিতীয়টি কি সত্যিই বিনামূল্যে। কিন্তু আপনি যদি একটি পণ্যই কিনতেন-তাহলে আপনার প্রয়োজন ছিল ৫০০ টাকার পণ্য। অর্থাৎ অফারটি আপনাকে বেশি পণ্য নিতে উৎসাহিত করেছে।

ব্যবসায়ীরাও কেন ডিসকাউন্ট দেয়?

তবে ডিসকাউন্ট মানেই ব্যবসায়ীর লোকসান-এমনটাও নয়। পুরোনো স্টক দ্রুত বিক্রি করা, নতুন পণ্যের জায়গা তৈরি করা, বিক্রি বাড়ানো কিংবা নতুন ক্রেতা আনা, এসব কারণেও ব্যবসায়ীরা ছাড় দিতে পারেন। অর্থাৎ ডিসকাউন্ট শুধু দাম কমানোর কৌশল নয়। এটি ক্রেতাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ানোরও একটি ব্যবসায়িক কৌশল।

আসল সাশ্রয় বের করার ৩ প্রশ্ন

তাহলে ডিসকাউন্টে কেনার আগে নিজেকে মাত্র তিনটি প্রশ্ন করুন। এক-পণ্যটি কি সত্যিই প্রয়োজন? দুই-অন্য দোকান বা অনলাইনে এর দাম কত? এবং তিন-ডিসকাউন্ট না থাকলেও কি আমি এটি কিনতাম? তিনটির উত্তর যদি হ্যাঁ হয়-তাহলে ছাড় আপনার জন্য সত্যিই লাভজনক হতে পারে। কারণ সাশ্রয়ের সবচেয়ে সহজ সংজ্ঞা হলো-কম দামে অপ্রয়োজনীয় কিছু কেনা নয়; প্রয়োজনীয় জিনিসটা সঠিক দামে কেনা।

দোকানের সামনে লেখা থাকতে পারে-৫০ শতাংশ ছাড়। কিন্তু আপনার জীবনে আসল সাশ্রয় কত শতাংশ-সেটা ঠিক করবে একটি জিনিসই-ডিসকাউন্ট নয়, আপনার প্রয়োজন। কারণ, কম দামে বেশি কেনাকাটা করাও খরচ।

আর কখনো কখনো-ডিসকাউন্টের সবচেয়ে বড় সাশ্রয় হলো, অফারটা দেখেও কিছু না কেনা।৷ তাই, ডিসকাউন্টে নয়, হিসাব করে কিনুন।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি