Print Date & Time : 14 October 2026 Wednesday 11:09 pm

সংকট উত্তরণের দাবি রাজপথে

image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রতিবাদে আট বছর আগে ফ্রান্সের রাজপথে হলুদ জ্যাকেটধারীদের (ইয়েলো ভেস্ট) বিক্ষোভ হয়েছিল। সেই আন্দোলন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর শাসনামলে প্রথম বড় সংকট তৈরি করেছিল। আগামী বছর ম্যাখোঁর ক্ষমতা ছাড়ার আগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে আবারও উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্সের রাজপথ। এবার অসন্তুষ্ট আর্থিক বাজারও।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারা এবং দীর্ঘদিনের লাগামহীন ব্যয়ের প্রবণতা বন্ধ করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা উদ্বিগ্ন। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সম্প্রতি ইতালিতেও একই ধরনের পরিস্থিতি বৈশ্বিক বন্ডবাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের ঋণের চাপে দেশটির সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ছে।

২০২৫ সালে ফ্রান্সের জিডিপির তুলনায় ঋণের পরিমাণ ছিল ১১৫ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশটির বাজেট ঘাটতি ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসকুর ঘাটতি কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে চলতি বছর ঘাটতি বেড়ে ৫ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর পরও কীভাবে তা কমানো হবে, সে বিষয়ে তিনি এখনও কিছু জানাননি।

অনিশ্চয়তার প্রভাব পড়ছে ব্যবসা ও বিনিয়োগে। ফ্রান্সের বৃহত্তম নিয়োগদাতা সংগঠন মেডেফের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান মনে করে, সরকারের অর্থনৈতিক নীতি তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রাজনীতিবিদদের সতর্ক করে ৬৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছর অর্থনৈতিক নীতির অচলাবস্থা চলতে থাকলে তাদের ব্যবসা ঝুঁকিতে পড়বে, এমনকি দেউলিয়া হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

ইউরোপীয় ব্যবসায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইনসিডের অর্থনীতির অধ্যাপক আন্তোনিও ফাতাসের মতে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ফ্রান্সকে আর্থিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন। প্রবৃদ্ধি কম এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন কীভাবে হবে, তা বোঝা কঠিন। ঋণের পরিসংখ্যানও খারাপ। আর্থিক বাজারের ধারণা, সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না।’

রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ছি। কারণ অনেক রাজনৈতিক দল সংকট চায়। তাদের ধারণা, এতে নির্বাচনে ভোটার বাড়বে।’

গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ইল্ড বা সুদের হার বেড়ে প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছায়, যা ২০০  ২ সালের জুলাইয়ের পর সর্বোচ্চ। বন্ডের দাম কমলে সাধারণত এর ইল্ড বেড়ে যায়। জাপানি বিনিয়োগকারীরা ঐতিহ্যগতভাবে ফ্রান্সকে সঞ্চয়ের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু নিজ দেশেই তুলনামূলক বেশি মুনাফার সুযোগ পাওয়ায় তাদের অনেকে ফ্রান্স থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছেন। এতে দেশটির সরকারের আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।

বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক বিবেচনায় নিলে ফ্রান্সের এতটা সংকটে পড়ার কারণ স্পষ্ট নয়। সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ এবং উন্নত অবকাঠামোর মতো অনেক সুবিধা রয়েছে দেশটির অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ওইসিডির গড়ের তুলনায় বেশি অর্থায়ন করা হয়। তবে সমস্যার একটি বড় জায়গা পেনশন সংস্কার। পেনশন খাতে ব্যয় কমাতে অবসরের বয়স ৬২ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ বছর করার পরিকল্পনা করেছিলেন মাখোঁ। এর মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি ইউরো সাশ্রয়ের লক্ষ্য ছিল তার। কিন্তু ২০২৪ সালের আগাম নির্বাচনের পর পার্লামেন্টে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় পরিকল্পনাটি আটকে যায়। ফলে অবসরের বয়স ৬২ বছর ৯ মাসেই সীমাবদ্ধ থাকে।

অর্থনীতিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি থাকলে বিষয়টি হয়তো এতটা উদ্বেগের হতো না। কিন্তু মাখোঁর বহুল আলোচিত অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের পরিকল্পনা এখনও কার্যত প্রথম ধাপেই আটকে রয়েছে। সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক লরাঁ ওয়ারলুজে মনে করেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ফ্রান্সের পরিস্থিতি বিভ্রান্তিকর হয়ে উঠেছে। কারণ আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে থাকা মেরিন লো পেন একদিকে অবসরের বয়স আবার ৬২ বছরে নামিয়ে আনার কথা বলছেন, অন্যদিকে গণভোটের মাধ্যমে ঋণ নেওয়ার ওপর সীমা আরোপের পরিকল্পনা করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রান্স যে পথে যায়, ইউরোজোনও সাধারণত সেদিকেই এগোয়। দেশটি যদি ইউরোর স্থায়িত্ব নিয়ে নতুন সংকট তৈরি করে, তাহলে ঋণ ও সদস্যদেশগুলোর মধ্যে ঋণের দায় ভাগাভাগি নিয়ে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনে আসবে। জার্মানি ছাড়া ইউরোজোনের প্রায় সব দেশেই বন্ডের ইল্ড বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব ইউরোপের বাইরেও পড়বে।

অনেকের আশঙ্কা ফ্রান্স ইউরোজোন ছেড়ে যেতে পারে, যা ‘ফ্রেক্সিট’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে। এই আশঙ্কা অমূলক নয় বলে ইতোমধ্যে ইউরোজোনের কয়েকটি দেশের অর্থমন্ত্রী ও ইসিবির কর্মকর্তারা ফরাসি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।