Print Date & Time : 15 October 2026 Thursday 10:51 am

আসলেই কি স্বাধীন হচ্ছে বেলুচিস্তান?

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোরগোল-পাকিস্তান ভেঙে কি জন্ম নিচ্ছে নতুন রাষ্ট্র ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’? বিচ্ছিন্নতাবাদী হামলার খবর আর ভার্চুয়াল স্বাধীনতার ঘোষণা কি আসলেই সত্য? নাকি বাস্তব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই সম্ভাবনা সম্পূর্ণ ভিন্ন?

বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের মানচিত্র থেকে আলাদা করে দেখা কার্যত অসম্ভব:

ভৌগোলিকভাবে এটি পাকিস্তানের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি এলাকা নিয়ে গঠিত।

চীনের শতকোটি ডলারের ‘সিপিইসি’ (CPEC) প্রকল্পের মূল প্রবেশদ্বার হলো এই প্রদেশের গদর ও ওরমারা গভীর সমুদ্রবন্দর, যা চীনকে সরাসরি ভারত মহাসাগরে যাওয়ার পথ করে দেয়।

পাকিস্তানের নিজস্ব গ্যাস চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ আসে এখান থেকেই। তামা, ক্রোমাইট, মার্বেল ও বিরল খনিজের এক অপার ভাণ্ডার লুকিয়ে আছে এই অঞ্চলে।

এই অঞ্চল হাতছাড়া হওয়ার অর্থ পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতি, সমুদ্র অর্থনীতি এবং চীনের সঙ্গে কৌশলগত বাণিজ্য লাইন চিরতরে নড়বড়ে হয়ে যাওয়া।

ভার্চুয়াল মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা আসলেও বাস্তবে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়ার কোনো শর্তই পূরণ হয়নি:

কোনো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা কেবল কাগুজে ঘোষণায় হয় না; এর জন্য প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ এবং কার্যকর সরকার ব্যবস্থা।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী আধুনিক ড্রোন, সামরিক বহর ও বিশেষ নিরাপত্তা অভিযানের মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই ধরে রেখেছে।

স্থানীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলো চোরাগোপ্তা হামলা চালালেও পুরো কোনো শহর বা জেলার স্থায়ী প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব।

বিশ্বের কোনো পরাশক্তি বা বৈশ্বিক সংস্থা বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদকে স্বীকৃতি দেয়নি:

জাতিসংঘ বা বড় কোনো রাষ্ট্র এমন কোনো সীমানা পরিবর্তনের ঝুঁকি নেবে না, যা দুই পারমাণবিক পরাশক্তি-পাকিস্তান ও ভারতের মাঝে পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করে।

বেইজিং তার বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও বেল্ট অ্যান্ড রোড করিডোর রক্ষায় সরাসরি ইসলামাবাদকে পূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত সমর্থন দেয়।

ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল ভেঙে নতুন রাষ্ট্র হলে পুরো মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় যে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে, আন্তর্জাতিক মহল কখনোই তা সমর্থন করবে না।

তাহলে দশকের পর দশক ধরে এই ক্ষোভ কেন টিকে আছে?

এটি কেবল ভূখণ্ডের লড়াই নয়, বরং অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও অধিকারের লড়াই।

বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করা হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ-তারা উন্নয়ন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুফল পাচ্ছেন না।

কেবল শক্তি প্রয়োগ বা সেনা অভিযান এই দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ দূর করতে পারবে না।

নিকট ভবিষ্যতে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্ন হওয়ার কোনো বাস্তব সুযোগ নেই। তবে পাকিস্তান যদি স্থানীয় জনগণকে আস্থায় নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা, সম্পদের সুষম বণ্টন ও সুশাসন নিশ্চিত না করে, তবে এই ক্ষোভ ও সংঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়েই থাকবে।

বেলুচিস্তান কি সত্যিই স্বাধীন হচ্ছে?

সোশ্যাল মিডিয়ায় বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার দাবি নিয়ে তোলপাড়! কিন্তু মাঠের বাস্তবতা কী? পাকিস্তানের ৪০ শতাংশ ভূখণ্ড এবং চীনের সিপিইসি করিডোরের লাইফলাইন এই প্রদেশ। কড়া সেনা নিয়ন্ত্রণ আর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির কারণে কোনো কাগুজে ঘোষণায় বেলুচিস্তান স্বাধীন হওয়া বাস্তবে একেবারেই অসম্ভব।

বেলুচিস্তানের ক্ষোভের আসল কারণ কী?

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বেলুচিস্তান-যেখান থেকে আসে দেশের ৪০ শতাংশ গ্যাস ও বিপুল খনিজ সম্পদ। অথচ স্থানীয়দের বড় অভিযোগ বঞ্চনা ও দারিদ্র্য নিয়ে। এই সংঘাত কেবল সীমান্তের নয়, অধিকার ও সুশাসনের। অস্ত্রের শক্তিতে নয়, সংকট মেটাতে প্রয়োজন সম্পদের ন্যায্য বণ্টন ও রাজনৈতিক।   

—জা. অর্থনীতি/এলএটি