Print Date & Time : 14 October 2026 Wednesday 05:49 pm

পুলিশের নিরাপত্তায় ফাটল, জনতার ভরসা কোথায়?

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

যাদের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা, যাদের দায়িত্ব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা, যাদের দিকে বিপদে পড়লে সাহায্যের আশায় তাকিয়ে থাকে মানুষ, সেই পুলিশ সদস্যই যদি দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক-নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে?

খুলনায় এক পুলিশ পরিদর্শকের ওপর হামলার পর জেলা পুলিশের নির্দেশ, রাতে একা চলাচল করা যাবে না। এটি কি শুধু পুলিশ সদস্যদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার সতর্কবার্তা? নাকি এর ভেতরে রয়েছে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন?
 
কী ঘটেছিল খুলনায়?

ঘটনাটি গত ৯ অক্টোবর, শুক্রবার মধ্যরাতের। পুলিশ জানায়, রূপসা উপজেলায় বিশেষ অভিযান শেষে খুলনা নগরীতে ফিরছিলেন পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহ আলম। রাত আড়াইটার দিকে খানজাহান আলী রোডে খুলনা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে হঠাৎ তার পথ আটকায় তিন ছিনতাইকারী। ছিনিয়ে নেওয়া হয় টাকা ও মুঠোফোন। বাধা দিতে গেলে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন তিনি। তাকে উদ্ধার করে অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়।

ঘটনার পর ওই রাতেই খুলনা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে লিখিত নির্দেশনা দেওয়া হয়, বিশেষ অভিযানসহ অন্যান্য দায়িত্ব পালনের সময় নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং রাতে একা চলাচল না করতে বলা হয় পুলিশ সদস্যদের। অর্থাৎ, অপরাধ দমনে মাঠে থাকা বাহিনীকেও এখন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে।

রাষ্ট্রে পুলিশের অবস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

পুলিশ কেবল অপরাধী ধরার একটি বাহিনী নয়; রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ও জননিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান। অপরাধ প্রতিরোধ, অপরাধের তদন্ত, অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনা, জনশৃঙ্খলা রক্ষা-এসব দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় ও আইন অনুযায়ী সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার স্বীকৃত। ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, নিরাপত্তা কোনো বিশেষ শ্রেণির মানুষের সুবিধা নয়; এটি নাগরিকের অধিকার।
আর এই অধিকার বাস্তবায়নে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি কমানো, দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং অপরাধী পার পেয়ে যাবে না-এমন বিশ্বাস তৈরি করাও জরুরি। কিন্তু, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যের নিরাপত্তাই যদি ঝুঁকিতে পড়ে, তাহলে সেই ঝুঁকি তাদের কাজের সক্ষমতা ও মানুষের আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

পুলিশের ক্ষমতা আছে, তবু নিরাপত্তার সংকট কেন?

পুলিশের হাতে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। অপরাধের তদন্ত, আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার এবং অপরাধ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও তাদের। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা থাকলেই প্রতিটি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়ে যায় না।
কারণ, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করে শুধু পুলিশ সদস্যের উপস্থিতির ওপর নয়; নির্ভর করে গোয়েন্দা তথ্য, দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা, টহলের কার্যকারিতা, অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের ওপরও।

খুলনার ঘটনাটি ঘটেছে বিশেষ অভিযান শেষে ফেরার পথে। পুলিশ সুপারের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিদর্শক শাহ আলম সাদাপোশাকে ছিলেন। এ ঘটনা দায়িত্ব পালনের পর যাতায়াতের নিরাপত্তা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সুরক্ষার বিষয়টিও সামনে এনেছে।
তবে এটিও মনে রাখতে হবে, একজন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন বলেই পুলিশ পুরোপুরি অকার্যকর, এমন সিদ্ধান্ত দেয়া যায় না। বরং দেখতে হবে, হামলার পর কত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, অভিযুক্তদের শনাক্ত করা যাচ্ছে কি না এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

পুলিশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আর সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; দুটি আলাদা বিষয় নয়। একটি কার্যকর পুলিশি ব্যবস্থার জন্য দুটিই জরুরি।

আইনশৃঙ্খলার অবনতির প্রশ্ন কোথায়?

খুলনায় এই হামলার আগেও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রূপসায় আক্তার ঢালী হত্যাকাণ্ড এবং দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় গুলি করে একজনকে হত্যার ঘটনার পর খুলনা জেলা পুলিশ বিশেষ অভিযান শুরু করে। রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় চলছিল এ অভিযান। অর্থাৎ, একদিকে অপরাধ দমনে অভিযান চলছে, অন্যদিকে অভিযান শেষে ফেরার পথে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে।

তবে কয়েকটি গুরুতর ঘটনা দিয়ে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মাত্রা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন দেশব্যাপী অপরাধের পরিসংখ্যান, আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা, মামলা নিষ্পত্তি ও গ্রেপ্তারের তথ্য এবং অপরাধের ধরনভিত্তিক বিশ্লেষণ। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট, অপরাধের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা জারি করাই যথেষ্ট নয়; সেই ঝুঁকি কমানোর কার্যকর ব্যবস্থাও দৃশ্যমান হতে হবে।

সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?

এবার প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের। একজন পুলিশ সদস্যের কাছে রয়েছে প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্ব। তারপরও তিনি হামলার শিকার হলে, রাতের রাস্তায় চলাচল করা একজন শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, দোকানদার কিংবা জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া নাগরিকের উদ্বেগ আরও বাড়বে-এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু নাগরিকের নিরাপত্তা শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতার ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। কোথায় অপরাধের ঝুঁকি বেশি, কোথায় টহল প্রয়োজন, জরুরি সহায়তা কত দ্রুত পৌঁছায় এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, এসবের জবাব দিতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।

একই সঙ্গে, পুলিশ সদস্যদের নিরাপদ যাতায়াত, দায়িত্ব পালনের ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, পুলিশকে নিরাপদ রাখা মানে শুধু একটি বাহিনীকে নিরাপদ রাখা নয়; কার্যকর আইন প্রয়োগের সক্ষমতাকেও সুরক্ষিত রাখা।

রাতের সড়কে পুলিশের টহল থেকে সাধারণ মানুষের চলাচল

পুলিশের কাজ শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে খুঁজে বের করা নয়, এমন পরিবেশ তৈরি করাও-যেখানে অপরাধ করার আগে অপরাধীকে পরিণতির কথা ভাবতে হয়, আর সাধারণ মানুষ ঘরে ফেরার পথে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন না। খুলনার ঘটনা তাই শুধু একজন পুলিশ পরিদর্শকের ওপর হামলার ঘটনা নয়; এটি পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা এবং নাগরিকের আস্থার প্রশ্ন।

যে রাষ্ট্রে পুলিশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করে, সেই রাষ্ট্রে পুলিশের নিরাপত্তাও নিশ্চিত হতে হবে। আর শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মনে একটিই প্রশ্ন-নিরাপত্তার দায়িত্ব যাদের হাতে, তারাই যদি নিরাপত্তা নিয়ে শংকায় থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কী করছে?  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি