Print Date & Time : 15 October 2026 Thursday 10:34 am

নতুন পে স্কেলেও কি ক্যাডার বৈষম্যের পুরোনো হিসাব থাকবে?

image

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: টাকার অঙ্কে বেতন হয়তো দ্বিগুণ হলো, কিন্তু মর্যাদার লড়াইয়ে কে কতদূর এগোলো? নতুন পে স্কেলে পকেটের ভার বাড়লেও বিসিএস ক্যাডারদের ভেতরের সেই বহু পুরোনো বৈষম্যের হিসাব কি সত্যিই মিলছে?

একই বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে রাষ্ট্রীয় চাকরিতে প্রবেশ, কিন্তু পদোন্নতি আর ক্ষমতার লড়াইয়ে কেন এই যোজন যোজন ফারাক? প্রশাসন ক্যাডারের একচ্ছত্র প্রভাব বনাম শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও প্রকৌশল ক্যাডারের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ-এই পুরোনো দ্বন্দ্ব নতুন জাতীয় পে স্কেলকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনার তুঙ্গে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, নতুন বেতন কাঠামো কি কেবল বেতনের অঙ্কই বদলাচ্ছে, নাকি মর্যাদা আর সুযোগ-সুবিধার পুরোনো বৈষম্যকেও গুটিয়ে আনছে?

আমাদের সরকারি চাকরিতে বিসিএস ক্যাডার ব্যবস্থা রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চালিকাশক্তি। তবে ক্যাডারভিত্তিক পদোন্নতি ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডার এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ক্যাডারের মধ্যে বৈষম্যের অভিযোগ বহু পুরোনো। শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা প্রকৌশলের মতো বিশেষায়িত ক্যাডারের কর্মকর্তারা তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে আসেন। অন্যদিকে, প্রশাসন ক্যাডারের কাজ মাঠ প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে। সমস্যা বাধায় তখনই, যখন অন্য ক্যাডারের অভিযোগ ওঠে-মন্ত্রণালয় ও শীর্ষ প্রশাসনিক পদগুলোতে তাঁদের মেধা প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত করে একটি নির্দিষ্ট ক্যাডারকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।

২০২৪ সালে ২৫টি ক্যাডারের সমন্বয়ে গঠিত আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ মাঠে নেমেছিল। তাদের মূল দাবি ছিল-উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ ক্যাডারের একচেটিয়া কোটা থাকা চলবে না, বরং উন্মুক্ত পরীক্ষা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন হতে হবে। এই ক্ষোভ আরও বাড়ে যখন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সচিবালয়ে পদোন্নতির অনুপাত ৫০:৫০ করার প্রস্তাব দেয় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে ক্যাডার বহির্ভূত করার চিন্তা উঠে আসে। এর জবাবে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারাও তাদের নিজস্ব ক্যারিয়ার কাঠামোর সুরক্ষা চেয়ে পাল্টা অবস্থান নেন।

এখন মূল প্রশ্ন হলো-নতুন পে স্কেলের সঙ্গে এই কাঠামোগত বিরোধের সম্পর্ক কোথায়?

সম্পর্কটা আসলে বেতন ছাড়িয়ে ক্ষমতার ভারসাম্যে। নতুন পে স্কেলে সর্বনিম্নের ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং ১ম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। তবে মূল বেতন বাড়লেই কি একজন কর্মকর্তার পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত হয়? একজন কর্মকর্তা কত দ্রুত পদোন্নতি পাচ্ছেন, বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণে যেতে পারছেন কিংবা নীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারছেন-সেটাই তো তার আসল মর্যাদা নির্ধারণ করে।

প্রশাসন ক্যাডারের যুক্তি হলো-রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা, তাই তাদের বিশেষ কাঠামো প্রয়োজন। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞ ক্যাডারদের কথা-স্বাস্থ্য বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণে যদি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদেরই কার্যকর ভূমিকা না থাকে, তবে সঠিক সরকারি নীতি প্রণয়ন অসম্ভব।

তাই আসল উত্তর হলো-নতুন পে স্কেল কেবল আর্থিক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু প্রশাসনিক বৈষম্যের নিরসন করতে পারে না। কারণ পে স্কেল তৈরি হয় বেতনের জন্য, আর বৈষম্য দূর করতে দরকার সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক সংস্কার। টাকা হয়তো সবার অ্যাকাউন্টে সমানুপাতে বাড়বে, কিন্তু কাজের মর্যাদা, সুযোগের সমতা আর দক্ষতার মূল্যায়ন না হলে সরকারি কর্মচারীদের ভেতরের এই অসন্তোষ কি আদৌ দূর হবে?

প্রশাসন ক্যাডারকে ঘিরে এত ক্ষোভ কেন?

একই বিসিএস পাস করে কেউ হন মাঠের কর্মকর্তা, আর কেউ সচিবালয়ের নীতি নির্ধারক। বেতন স্কেল সবার এক হলেও পদোন্নতি আর সুযোগের বেলায় এই আকাশ-পাতাল তফাত কেন? শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর প্রকৌশল ক্যাডারের কর্মকর্তারা কি শুধুই পে স্কেলের স্কেল মেলাবেন, নাকি প্রশাসনের শীর্ষ পদে নিজেদের যোগ্যতার মূল্যায়নও পাবেন?

পে স্কেল বদলাল, ক্যাডার বৈষম্য কি বদলাবে?

সরকারি চাকরিতে নতুন পে স্কেল কার্যকর হয়েছে। ২০তম গ্রেড থেকে ১ম গ্রেড-সবার মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ। কিন্তু মূল বেতন বাড়লেই কি বৈষম্য শেষ? উপসচিব পদে পদোন্নতি আর মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে-সেই বহু পুরোনো বিরোধ তো আজও অমীমাংসিত!  

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি