Print Date & Time : 14 October 2026 Wednesday 03:10 am

শীতে ইউরোপে গ্যাস–সংকট, ঝুঁকিতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার এলএনজি বাজার

image

বাণিজ্য ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার প্রভাবে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজার গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বের অন্যতম প্রধান এলএনজি সরবরাহকারী দেশ কাতার তাদের নির্ধারিত রপ্তানি নাটকীয়ভাবে কমাতে বাধ্য হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কাতার এবার ৫৩৬টি কম অর্থাৎ মাত্র ৯৮টি এলএনজি জাহাজের চালান পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বের মোট বার্ষিক সরবরাহের প্রায় ৯ শতাংশ।

শীত মৌসুম সামনে রেখে এই সরবরাহ সংকট ইউরোপের দেশগুলোর জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। বর্তমানে ইউরোপের গ্যাসের মজুত মাত্র ৭২ শতাংশ পূর্ণ রয়েছে, যা ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের এই সময়ের গড় ৯০ শতাংশ মজুতের তুলনায় সর্বনিম্ন; এমনকি জার্মানির মতো শীর্ষ অর্থনীতির দেশে এই মজুত নেমে এসেছে মাত্র ৫৭ শতাংশে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক সিক্স ওয়ান কমোডিটিজের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শীতে ঠান্ডা বেশি পড়লে পরিস্থিতি সামাল দিতে সেখানে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের বিশ্লেষক ঝি শিন চং সতর্ক করেছেন যে ডিসেম্বরের মধ্যে কাতারের সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এবং নভেম্বরে তীব্র ঠান্ডা শুরু হলে ইউরোপের বাজারে গ্যাস কেনার তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা দেবে, যার ফলে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম বর্তমানের ২৫ ডলার থেকে একলাফে ৩০ থেকে ৪০ ডলারে উঠে যেতে পারে।

ইউরোপের ধনী দেশগুলো চড়া দাম দিয়ে বিশ্ববাজার থেকে বিকল্প গ্যাস কেনার সামর্থ্য রাখলেও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর। চলতি বছর এশিয়ার দেশগুলো ইতোমধ্যে গত বছরের তুলনায় ৭০ লাখ টন কম অর্থাৎ ১৯ কোটি ৩০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ১৪০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে স্পট মার্কেট থেকে চড়া মূল্যে গ্যাস সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি না পাওয়ায় দেশের শিল্প খাতে উৎপাদন ও বিদ্যুৎ সরবরাহ আগে থেকেই ব্যাহত হচ্ছে; আগামী শীতে ইউরোপ বিশ্ববাজারের বড় অংশ দখল করে নিলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট আরও প্রকট রূপ নেওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্লেষকদের মতে, কাতারের উৎপাদন স্বাভাবিক না হলে ইউরোপের মজুত ধরে রাখতে আগামী শীতের আগে অতিরিক্ত ২ কোটি টন গ্যাসের প্রয়োজন হবে, যা পুরো ২০২৭ সাল জুড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম বাড়তি রাখতে পারে। তবে এই সংকটকালীন পরিস্থিতির উল্টো পিঠে বিশ্ব এলএনজি বাজার এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের দিকে এগোচ্ছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশে নতুন নতুন বড় আকারের এলএনজি প্রকল্পের কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে। ফলে চলমান এই স্বল্পমেয়াদি তীব্র ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর, ২০৩০ সালের দিকে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়ে গ্যাসের দাম আবার অস্বাভাবিকভাবে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।