Print Date & Time : 15 October 2026 Thursday 02:47 am

একটি জার্সি, এক যুগের আবেগ!

image

অনলাইন ডেস্ক: 

শেষ রাত, শেষ ম্যাচ

একটা সময় ছিল-আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসিকে দেখাটাই ছিল কোটি মানুষের অভ্যাস। আর এখন সেই অভ্যাসেরও শেষ।

বুয়েনস আয়ার্সের ঐতিহাসিক মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম সাক্ষী হলো এক যুগের সমাপ্তির। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবার মাঠে নামলেন লিওনেল মেসি।

৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে শেষ ম্যাচেও যেন নিজের গল্পটাই লিখলেন তিনি-একটি গোল, দুটি অ্যাসিস্ট, আর শেষ পর্যন্ত জয়।

২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচেও দলের তিনটি গোলেই সরাসরি অবদান রেখে বিদায় নিলেন ফুটবলের এই মহাতারকা।

বিদায়ের আগেই সিদ্ধান্ত ছিল

তবে বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটি মেসির অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্ত নয়।

আগস্টেই ৩৯ বছর বয়সী মেসি ঘোষণা করেছিলেন, আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল আর চালিয়ে যাবেন না। ফিফাও নিশ্চিত করেছিল, ৬ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচটিই হবে তার আনুষ্ঠানিক বিদায়ী উপস্থিতি। অর্থাৎ, মনুমেন্টালের রাতটি ছিল সিদ্ধান্তের নয়-একটি দীর্ঘ অধ্যায়কে সম্মানের সঙ্গে শেষ করার রাত।

২০০৫ থেকে ২০২৬-এক দীর্ঘ যাত্রা

২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে অভিষেক।

শুরুটা হয়েছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের উপস্থিতি আর লাল কার্ডের হতাশা দিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে বদলে গেছে গল্পটা।

সমালোচনা এসেছে। তুলনা হয়েছে দিয়েগো ম্যারাডোনার সঙ্গে। শিরোপা না জেতার দায়ও নিতে হয়েছে মেসিকে।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে হার। ২০১৫ এবং ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হতাশা। এমনকি ২০১৬ সালে চিলির কাছে কোপা আমেরিকার ফাইনাল হারের পর জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই গল্প সেখানেই শেষ হয়নি।

যে প্রত্যাবর্তন বদলে দিল সবকিছু

জাতীয় দলে ফিরে মেসি যেন নিজের গল্পের শেষ অধ্যায়টিই বদলে দিলেন।

২০২১ সালে কোপা আমেরিকা-আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির প্রথম বড় সিনিয়র আন্তর্জাতিক শিরোপা। এরপর ২০২২ সালে ফাইনালিসিমা। আর তারপর কাতার বিশ্বকাপ।

ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক ফাইনালে দুই গোল এবং টাইব্রেকারে গোল করে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেন মেসি।

যে ট্রফির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটিই উঠেছিল তার হাতে। এরপর ২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের হয়ে মেসির বড় সিনিয়র ট্রফির তালিকায় তাই রয়েছে-(গ্রাফিক্স আকারে যাবে), ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ ফাইনালিসিমা, ২০২২ বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকা

শেষ বিশ্বকাপেও ফাইনাল

২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা সেই আসরে ফাইনাল পর্যন্ত গিয়েছিল। কিন্তু স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়। তবুও ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মেসির জন্য ২০২৬ হয়ে থাকে আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। ২০০৬ থেকে ২০২৬-ছয়টি বিশ্বকাপ। আর বিশ্বকাপের ইতিহাসে তার নামের পাশে জমা হয়েছে একের পর এক রেকর্ড।

শেষ ম্যাচেও মেসিই মেসি

বিদায়ী ম্যাচের প্রথমার্ধ গোলশূন্য। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে যেন বদলে গেল সবকিছু। ৪৮ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে নিকোলাস ওতামেন্দি গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন।

এরপর ৬১ মিনিটে নিকো পাজের গোলেও অবদান মেসির। আর ৭১ মিনিটে সেই মুহূর্ত-পেনাল্টি থেকে নিজেই গোল করলেন মেসি। শেষ ম্যাচেও দলের তিন গোলের প্রতিটিতেই সরাসরি জড়িয়ে থাকলেন তিনি।
আর্জেন্টিনা ৩, বেনিন ০।

আর মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচের স্কোরবোর্ডে লেখা হলো-একটি গোল, দুটি অ্যাসিস্ট, একটি জয়।

শেষবার জাতীয় সংগীত, চোখে জল। কিন্তু সংখ্যার বাইরের গল্পটা ছিল আরও আবেগের। জাতীয় সংগীতের সময় চোখে জল দেখা যায় মেসির। মনুমেন্টালের গ্যালারিতে তখন হাজারো কণ্ঠে একটাই ভালোবাসা।

যে ১০ নম্বর জার্সি হয়ে উঠেছিল আর্জেন্টিনার ফুটবলের এক প্রতীক, সেই জার্সিতেই শেষবারের মতো মাঠে নামলেন মেসি। ম্যাচের দশম মিনিটেও মেসিকে ঘিরে বিশেষ সম্মান জানায় পুরো স্টেডিয়াম।

শেষ বাঁশির পর সতীর্থ, প্রতিপক্ষ-সবাই তাকে ঘিরে দাঁড়ায়। কারণ সেদিন শুধু একটি ম্যাচ শেষ হয়নি। শেষ হয়েছে একটি প্রজন্মের অভ্যাস।

মেসি আর আর্জেন্টিনা-ভালোবাসার গল্পটি সহজ ছিল না

মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্ক শুরু থেকেই নিখুঁত ছিল না। একসময় প্রশ্ন উঠেছে-ক্লাবের মেসি আর জাতীয় দলের মেসি কি একই? সমালোচনা হয়েছে তার নেতৃত্ব নিয়ে। কিন্তু মেসি উত্তর দিয়েছেন মাঠে।

২০২১ কোপা আমেরিকা থেকে শুরু করে ২০২২ বিশ্বকাপ-একটির পর একটি সাফল্য আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সঙ্গে তার সম্পর্ককে বদলে দিয়েছে।

যে মানুষটিকে একসময় জাতীয় দলের ব্যর্থতার প্রতীক বানানো হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তিনিই হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ফুটবল প্রতীকগুলোর একজন।

স্কালোনির চোখেও মেসির বিকল্প নেই

মেসির বিদায়ের পর এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনা কেমন হবে? কোচ লিওনেল স্কালোনিও স্বীকার করেছেন, সামনে কঠিন সময় আসবে।

নতুন খেলোয়াড় আসবেন। নতুন কৌশল তৈরি হবে। নতুন দলও গড়ে উঠবে। কিন্তু মেসি যে প্রভাব তৈরি করেছেন, সেটির সঙ্গে তুলনা করা কঠিন। কারণ একজন খেলোয়াড় শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দিয়ে একটি দলকে বদলে দেন না। কখনো কখনো তিনি একটি দেশের ফুটবল-পরিচয়ের অংশ হয়ে যান। মেসি ঠিক সেটিই হয়েছেন।

শেষ সংখ্যাগুলোও তাই ইতিহাস

২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষে মেসির নামের পাশে-(ফুলপ্লেট গ্রাফিক্স যাবে), ২০৮ টি ম্যাচ, ১২৬ টি গোল।

আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ এবং সবচেয়ে বেশি গোল। সঙ্গে বিশ্বকাপ, দুই কোপা আমেরিকা, ফাইনালিসিমা এবং অলিম্পিক স্বর্ণের স্মৃতি। আর ২০২৬-এর শেষ ম্যাচে যোগ হলো আরও একটি বিশেষ অধ্যায়-এক গোল, দুই অ্যাসিস্ট এবং ৩-০ ব্যবধানের জয়।

আর্জেন্টিনার জার্সি শেষ, মেসির গল্প নয়

তবে এখানেই মেসির ফুটবল শেষ নয়। ক্লাব ফুটবলে এখনো ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন তিনি। শুধু আর কখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি পরে তাকে দেখা যাবে না। আর এটাই হয়তো বিদায়ের সবচেয়ে কঠিন সত্য।

একটি প্রজন্ম মেসিকে দেখে বড় হয়েছে। তার গোলের সঙ্গে উদযাপন করেছে। তার হারে কেঁদেছে। তার বিশ্বকাপ জয়ে রাস্তায় নেমেছে। এখন থেকে সেই মানুষটির জাতীয় দলের ম্যাচ দেখতে আর অপেক্ষা করতে হবে না। কারণ অপেক্ষার ম্যাচটি হয়ে গেছে শেষ।

গ্রাসিয়াস, লিও; আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর-চিরকালীন

মেসির গল্পে হয়তো শেষ ম্যাচের বাঁশি বেজেছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে তার নামের পাশে কোনো শেষ বাঁশি নেই। কারণ ২১ বছর পর মেসি শুধু জাতীয় দলের জার্সি খুলে রাখেননি-তিনি রেখে গেছেন এমন এক অধ্যায়, যার শেষ লেখা হয়তো আজ হলো…কিন্তু গল্পটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলবে।


  —জা. অর্থনীতি/এলএটি