Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 03:05 am

কীভাবে এলো আন্তর্জাতিক কফি দিবস?

image

অনলাইন ডেস্ক: সকালের ঘুমঘুম চোখে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম কফি, ব্যস্ত শহরের কোনো ক্যাফেতে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা, কিংবা রাতে কাজের চাপে ক্লান্ত শরীরে একটু শক্তি জোগানো- আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সাথে কফি যেন খুব গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের সকালটা শুরুই হয় এই এক কাপ কফির ঘ্রাণে।

কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, যে কফির কাপে চুমুক দিয়ে আপনার দিনটা শুরু হচ্ছে, সেই কফি আপনার হাতে পৌঁছানোর পেছনের গল্পটা ঠিক কেমন? কফি গাছের যত্ন নেওয়া সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে কফি বীজ সংগ্রহকারী, প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্মকর্তা, পরিবহন কর্মী কিংবা ক্যাফের বারিস্তা- কত শত মানুষের ঘাম আর শ্রম মিশে আছে ওই এক কাপ পানীয়র মধ্যে?

এই হাজারো মানুষের কঠোর শ্রম, বিশ্বজুড়ে কফির অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং এই শিল্পখাতের নানা চ্যালেঞ্জের কথা বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিতেই প্রতি বছর ১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কফি দিবস। তবে ১ অক্টোবরই কেন? এর পেছনে কী ইতিহাস রয়েছে?

আন্তর্জাতিক কফি দিবসের ধারণাটি কিন্তু একদিনে হঠাৎ করে আসেনি। আন্তর্জাতিক কফি সংস্থার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৩ সালের মার্চে জার্মান কফি অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি হলগার প্রাইবিস প্রথম একটি অভিন্ন কফি দিবস আয়োজনের প্রস্তাব দেন। এরপর কফি উৎপাদনকারী এবং আমদানিকারক দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক কফি সংস্থার সদস্যরা ২০১৪ সালের মার্চে একটি সিদ্ধান্ত নেন। লক্ষ্য ছিল খুব স্পষ্ট- বিশ্বের একেক দেশে একেক দিনে কফি দিবস পালনের বদলে পুরো বিশ্বজুড়ে একটি নির্দিষ্ট দিনে কফিকে উদযাপন করা। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই বেছে নেওয়া হয় ১ অক্টোবরকে।

এরপর ২০১৫ সালের ১ অক্টোবর প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয় আন্তর্জাতিক কফি দিবস। এর আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল ইতালির মিলানে অনুষ্ঠিত এক বৈশ্বিক কফি ফোরামের মাধ্যমে। তবে এখানে একটি মজার তথ্য জানা জরুরি- ১ অক্টোবর কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক কফি আবিষ্কারের তারিখ বা কোনো বিখ্যাত ব্যক্তির জন্মদিন নয়! বরং বিশ্বজুড়ে কফি শিল্পকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার লক্ষ্যেই কৌশলগতভাবে এই তারিখটি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কফি শুধু একটি পানীয় নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। উৎপাদনকারী দেশের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড- বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা এই কফির ওপর নির্ভরশীল। কফির দাম একটু বাড়লে বা কমলে কেবল ক্যাফের বিল বদলায় না, এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের চুলায়। তাই কফি চাষীদের ন্যায্য মজুরি ও পরিবেশগত টেকসইতার প্রশ্নটি এই দিবসে প্রধান আলোচনা হয়ে ওঠে।

বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আজ কফি চাষ মারাত্মক হুমকির মুখে। অনাবৃষ্টি, অসময়ে অতিবৃষ্টি আর বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কফি উৎপাদনের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে। তাই এই দিবসের উদ্দেশ্য শুধু কফি পান করা নয়, বরং কফি খাতের সামাজিক ও পরিবেশগত সুরক্ষায় বিশ্ববাসীকে সচেতন করা।

এই আন্তর্জাতিক কফি দিবসে ২০২৬ সালে এসে যুক্ত হয়েছে এক নতুন ও ঐতিহাসিক মাইলফলক। ২০২৬ সালের ১০ মার্চ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ১ অক্টোবরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আন্তর্জাতিক কফি দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এই স্বীকৃতির মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে কফির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব আরো সুদৃঢ় হলো।

পরের বার যখন ক্যাফেতে বসে বা ঘরে ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে চুমুক দেবেন, তখন একবার অন্তত ভাববেন- এই এক কাপ কফির পেছনের অদৃশ্য মানুষগুলোর কথা। কাপের স্বাদের পাশাপাশি পেছনের মানুষগুলোকে সম্মান জানানোই আন্তর্জাতিক কফি দিবসের মূল সার্থকতা।

আপনি প্রতিদিন সকালে যে কফিতে চুমুক দেন, জানেন কি ১ অক্টোবর কেন আন্তর্জাতিক কফি দিবস পালিত হয়? অনেকে ভাবেন এই দিনে বুঝি কফি আবিষ্কার হয়েছিল বা কোনো কফি প্রেমিকের জন্ম হয়েছিল! কিন্তু আসল সত্যিটা সম্পূর্ণ আলাদা। ২০১৫ সালে কফি উৎপাদনকারী সাধারণ কৃষক ও শ্রমীদের অধিকার রক্ষা এবং পুরো বিশ্বের কফি শিল্পকে এক সুতোয় বাঁধতেই বেছে নেওয়া হয় এই বিশেষ দিনটি। তাই কফি পানের পাশাপাশি কফির পেছনের মানুষদের অবদানকে সম্মান জানাতেই উদযাপিত হয় এই দিন।

কফি শুধু আপনার ক্লান্তি দূর করার পানীয় নয়, এটি এখন জাতিসংঘের স্বীকৃত এক বৈশ্বিক শক্তি! ২০২৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক কফি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে কফি চাষীদের রক্ষা করা এবং টেকসই কফি উৎপাদন নিশ্চিত করতেই বিশ্বব্যাপী এই শক্ত উদ্যোগ। তাই পরের বার কফি পানের সময় মনে রাখবেন, আপনার এক কাপ কফির পেছনে কাজ করছে বিশ্ব রাজনীতির বড় এক সমীকরণ!  

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি