ধর্ম ও চিন্তা ডেস্ক: ইসলামে মানুষের জান, মাল ও সম্মানের নিরাপত্তাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মুসলমানের সম্পদ অন্য মুসলমানের জন্য যেমন সম্মানযোগ্য, তেমনি অমুসলিমের বৈধ সম্পদও অন্যায়ভাবে দখল করার অনুমতি নেই। কারও টাকা-পয়সা, জমি, ব্যবসার অর্থ, আমানত, উত্তরাধিকার কিংবা অন্য কোনো সম্পদ অন্যায়ভাবে নিজের দখলে নেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ। কারণ এর সঙ্গে শুধু আল্লাহর বিধান লঙ্ঘনের বিষয় নয়, অন্য একজন মানুষের অধিকার নষ্ট করার বিষয়ও জড়িত।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা’ (সুরা আন-নিসা, ৪:২৯)। এই আয়াতের মাধ্যমে মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রতারণা, জালিয়াতি, চুরি, জবরদখল, আমানতের খেয়ানত কিংবা কারও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তার সম্পদ নিয়ে নেওয়া— সবই এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে।
অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ সব সময় প্রকাশ্য চুরির মাধ্যমে হয় না। কোনো কর্মচারী প্রতিষ্ঠানের টাকা নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারেন, ব্যবসার অংশীদার হিসাব গোপন করে অন্য অংশীদারের অর্থ আত্মসাৎ করতে পারেন, কেউ উত্তরাধিকারীদের প্রাপ্য সম্পত্তি আটকে রাখতে পারেন, আবার কেউ অসহায় মানুষের জমি বা বাড়ি কৌশলে নিজের নামে নিয়ে নিতে পারেন। বাহ্যিকভাবে এসব কাজের ধরন ভিন্ন হলেও অন্যের অধিকার অন্যায়ভাবে নিজের দখলে নেওয়ার কারণে এগুলো একই ধরনের গুরুতর অন্যায়ের অন্তর্ভুক্ত।
কোরআনে এতিমের সম্পদ আত্মসাতের ব্যাপারে বিশেষভাবে ভয়াবহ সতর্কবার্তা এসেছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা তাদের পেটে আগুনই ভক্ষণ করছে; অচিরেই তারা জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে’ (সুরা আন-নিসা, ৪:১০)। এতিমরা নিজেদের অধিকার রক্ষায় অনেক সময় অসহায় থাকে। তাই তাদের সম্পদের ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
অন্যের জমি দখলের ব্যাপারেও রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। সহিহ হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে এক বিঘত জমিও দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তর জমি পরানো হবে’ (সহিহ আল-বোখারি ও সহিহ মুসলিম)। অর্থাৎ জমির পরিমাণ সামান্য হলেও মালিকের অধিকার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়াকে ইসলাম তুচ্ছ মনে করে না।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ শুধু দুনিয়ার আইনের বিষয় নয়, আখিরাতের জবাবদিহির সঙ্গেও যুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাক। কারণ জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকারসমূহে পরিণত হবে।’ (সহিহ মুসলিম)। অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে দখল করা জুলুমের একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ।
ইসলামে মানুষের অধিকারকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো, আল্লাহর হক এবং বান্দার হক এক বিষয় নয়। কোনো ব্যক্তি নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করলে আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু অন্য মানুষের সম্পদ বা অধিকার নষ্ট করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকারও যথাসম্ভব ফিরিয়ে দিতে হবে। শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া যথেষ্ট নয়।
যে ব্যক্তি অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করেছে, তার জন্য প্রথম কাজ হলো অন্যায় থেকে ফিরে আসা এবং আন্তরিকভাবে তওবা করা। এরপর যার সম্পদ নেওয়া হয়েছে, তা তাকে ফিরিয়ে দিতে হবে। সম্পদ নষ্ট হয়ে গেলে তার যথাযথ মূল্য পরিশোধ করতে হবে। সম্পদের মালিক মারা গেলে তার বৈধ উত্তরাধিকারীদের কাছে তা পৌঁছে দিতে হবে। আর মালিককে খুঁজে পাওয়া না গেলে বিষয়টি জটিল; এমন পরিস্থিতিতে নিজের সিদ্ধান্তে অর্থ ভোগ না করে যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ কারণে উত্তরাধিকার সম্পত্তি আত্মসাৎ, আমানতের টাকা ফেরত না দেওয়া, শ্রমিকের পাওনা আটকে রাখা, ব্যবসায় অংশীদারের অর্থ গোপন করা, ঘুষ বা প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের সম্পদ নেওয়া— এসবকে শুধু ‘টাকার ব্যাপার’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন মানুষের অধিকার জড়িত থাকতে পারে।
তবে ইসলাম অপরাধের ক্ষেত্রে তওবার দরজাও বন্ধ করেনি। কেউ অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করে পরে অনুতপ্ত হলে তাকে অন্যায় সম্পদ ফেরত দিতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রকৃত তওবার সঙ্গে অন্যের হক আদায়ের বিষয়টি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।