Print Date & Time : 16 October 2026 Friday 08:45 am

নারায়ণগঞ্জে কুকুর আতঙ্ক: বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যু

image

এনামুল হক, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ): ছয় বছরের শিশু আফিফা সুলতানা খাতা-পেন্সিল আর পুতুল নিয়ে বাড়ির উঠানে খেলছিল। হঠাৎ এক ঝাঁক বেওয়ারিশ কুকুরের হিংস্র থাবায় মুহুর্তেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার কোমল শরীর। এমন ঘটনা নারায়ণগঞ্জের প্রতিদিনের নিষ্ঠুর বাস্তবতা।

গত কয়েকদিনে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার ৩ গ্রামের অর্ধশতাধিক মানুষ পাগলা কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন। এ খবরে গোটা জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

এদিকে কিছুদিন আগে গাইবান্ধা জেলায় কুকুরের কামড়ে ৫ জনের মৃত্যুর খবরও জেলাবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে।

পাবনায় বাসচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত

সরকারিভাবে জেলাভিক্তিক বেওয়ারিশ কুকুরের সুনির্দিষ্ট জরিপ না থাকলেও জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য শাখার আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, জেলাজুড়ে বর্তমানে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার।

নারায়ণগঞ্জ জেলা, উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকার গত এক দশকের (২০১৬-২০২৬) একটি নিবিড় পরিসংখ্যান পেয়েছে জাতীয় অর্থনীতি।

জাতীয় অর্থনীতির অনুসন্ধান ও নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার নারী-পুরুষ-শিশু। প্রতি বছরে গড়ে দংশন হচ্ছে ৮ থেকে ৯ হাজার মানুষ। আক্রান্তদের ৭০ শতাংশই শিশু ও স্কুলগামী শিক্ষার্থী। 

নারায়ণগঞ্জ জেলায় গত এক দশকে কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে আনুমানিক ১৪ জন নারী-শিশু মারা গেছেন। তবে এই সংখ্যার বাইরেও অনেক মৃত্যুর ঘটনা লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার রূপগঞ্জ উপজেলা, সিদ্ধিরগঞ্জ, আড়াইহাজার উপজেলা ও নাসিক এলাকা সবচেয়ে ভয়াবহতার কেন্দ্রস্থল।

কুকুরে কামড়ে আক্রান্ত এমন ২১ জনের ওপর জরিপ চালায় জাতীয় অর্থনীতি। জরিপে বেশ কয়েকটি বিষয় উঠে এসেছে।

২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ইতালি, কফিনবন্দী হয়ে ফিরে বাবার পাশে চিরনিদ্রায়

জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ অনেক সময় কুকুরের কামড়ের পর হাসপাতাল না গিয়ে ওঝা, কবিরাজ ও ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেন। ফলে জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার পর রোগীকে আর বাঁচানো সম্ভব হয় না এবং এহুলো অনেক সময় সরকারি খাতায় নথিবদ্ধ হয় না। কামড়ের পর সঠিক সময়ে (প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে) জলাতঙ্কের প্রতিষেধক টিকা না নেওয়ার কারণে এই অনাকাঙ্খিত মৃত্যুগুলো ঘটছে। আধুনিক চিকিৎসার যুগেও অসচেতনতা ও ভ্যাকসিন সংকটের কারণে প্রতিটি মৃত্যুই আসলে একেকটি প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যর্থতার প্রতীক। 

স্থানীয়রা যা বলছেন

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া মোড় থেকে শুরু করে রূপগঞ্জ বা আড়াইহাজারের প্রত্যন্ত গ্রামে বিকেল গড়াতেই চারপাশ চলে যাচ্ছে বেওয়ারিশ কুকুরের দখলে। কোথাও দল বেঁধে পথচারীকে তাড়া করছে, কোথাও আকার ওৎ পেতে থাকা পাগলা কুকুর কামড়ে দিচ্ছে একের পর এক মানুষকে।

স্থানীয়রা বলছেন, আক্রান্তদের ৭০ শতাংশেরই বয়স ১৫ বছরের নিচে। বিশেষ করে স্কুলগামী এবং নারীরা কুকুরের আক্রমণের প্রধান শিকার হচ্ছেন।

রূপগঞ্জ, আড়াইহাজার ও ফতুল্লার স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, কুকুর মারা যাবে না ভালো কথা। কিন্তু কুকুর যখন আমাদের সন্তানদের কামড়ে শেষ করে দিচ্ছে, তখন আমাদের নিরাপত্ত দেবে কে?

আড়াইহাজারে আক্রান্তের শিকার জুবায়ের ও জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, আচমকা কুকুরটা এসে লাফ দিয়ে কামড়ে দিয়ে গেল। পথে যাকে সামনে পেয়েছে, তাকেই আক্রমণ করেছে।

আড়াইহাজারের লোকজন বলছেন, বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রবে হাঁটাও দায়। বিশেষ করে স্কুল শিক্ষার্থী ও শিশুদের জন্য ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আড়াইহাজারের অনেক এলাকার মানুষ ভয়ে এখন লাঠিসোটা নিয়ে ঘুরছে।

এদিকে নগরপাড়া এলাকার জহিরুল ইসলাম বলেন, কুকুরের কামড়ে কয়েক বছর আগে আমার ছোট ভাই মারা গিয়েছিল। রুহিলা এলাকার আবুল হোসেনের শিশু মেয়ে রাফিয়া গত দুই বছর আগে কুকুরের কামড়ে মারা গেছে।

আবুল হোসেন বলেন, কুত্তার লেইগা পোলাপান ঘর থেইকা বাইর অইতে পারে না। আমার মাইয়াডা রুটি নিয়া বাইরে গেছিল। লগে লগে কুত্তায় কামড়ায়। টিকা দেওয়াইছিলাম। কয়দিন ভোগার পরে মারা গেছিল। 

মরিয়মের মৃত্যু: গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা ডিবিতে

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কায়েতপাড়া ইউনিয়নে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে তিন গ্রামের ৭ জন কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছে। ২০১৭ ও ২০১৮ সালে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসাপাতালে চিকিৎসা নেন ১১ হাজার ৬৯৪ জন রোগী। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাগলা কুকুরের কামড়ে আড়াইহাজারে ১০ জন আক্রান্ত হয়েছে। ২০২২ সালে তিন মাসে কুকুরের কামড়ে শুধু ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে চিকিৎসা নেয় সাড়ে ৪ হাজার রোগী। ২০২৪ সালের ১৩ জুলাই সোনারগাঁয়ে পাগলা কুকুরের কামড়ে ৪৫ জন আক্রান্ত হয়েছে।

২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধিরগঞ্জের হীরাঝিল এলাকায় পাগলা কুকুরের কামড়ে শিশুসহ ১৩ জন আক্রান্ত হয়। ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর ফতুল্লায় পাগলা কুকুরের কামড়ে ৪০ জন আক্রান্ত হয়েছে। এটা সাধারণ একটা পরিসংখ্যান মাত্র।

অনুসন্ধান ও পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে রূপগঞ্জে ৪, আড়াইহাজারে ৫, সিদ্ধিরগঞ্জে ১, সোনারগাঁয়ে ২, ফতুল্লায় ১, বন্দরে একজন মারা গেছে।  

ভ্যাকসিন সংকট

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুকুরে কামড়ানোর পর প্রতিটি সেকেন্ড যখন জীবন-মত্যুর সীমানা নির্ধারণ করে, তখন নারায়ণগঞ্জের চিকিৎসা ব্যবস্থা যেন তামাশা তৈরি করছে। নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল (ভিক্টোরিয়া) কিংবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে গেলে প্রায়ই রোগীদের শুনতে হয় ‘টিকা নেই, মহাখালী চলে যান।’

সরকারি চাহিদার মাত্র ১৫-২০ ভাগ সরবরাহ থাকায় প্রতিদিন শত রোগীকে ফিরে যেতে হচ্ছে খালি হাতে। একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্যাকসিনের ডোজ বেসরকারি ফার্মেসি থেকে কিনতে খরচ হয় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। নিন্মআয়ের দিনমজুরের পক্ষে এই টাকা জোগাড় করা নিজের সন্তানের চিকিৎসা না করিয়ে মৃত্যুর মুখে ছেড়ে দেওয়ার সমান। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে জেলায় কুকুরের টিকাদান কর্মসূচি স্থবির হয়ে আছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর আগে যে ‘গণ-টিকাদান’ কর্মসূচির কথা বলতো, তা ছিল কেবলই লোক দেখানো। এখন টিকা নেই, তাই ৫ গুণ বেশি নতুন বাচ্চার জন্ম হয়। ফলে ভাইরাসের বিস্তার কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না।

স্থানীয় আনোয়ার হোসেন মোল্লা বলেন, আমার নাতীকে কুকুর কামড় দিলে রূপগঞ্জ হাসপাতালে নিয়ে যাই। গেলে ডাক্তার বলে এখানে না, মহাখালী চলে যান।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে ৫৭৫২ জন। যার মধ্যে ৩২৪০টি ভ্যাকসিন কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা বাইরে থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। ২০১৮ সালে ৫৯৪২ জন রোগীর মধ্যে ৩০২৬টি ভ্যাকসিন রোগীরা বাইরে থেকে সংগ্রহ করেন।

আইনের ফাঁদ বনাম মানুষের জীবন

জাতীয় অর্থনীতির অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রাণী অধিকার রক্ষা আর মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এই দুইয়ের টানাপোড়েনে রক্ত ঝরছে কেবল সাধারণ মানুষের।

বিশেজ্ঞরা বলছেন, কুকুর নিধন বন্ধ করা হয়েছে মানবিক কারণে। কিন্তু বিকল্প হিসেবে যে বন্ধাকরণ এবং শতভাগ গণ-টিকাদানের ব্যবস্থা করার কথা ছিল, তা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর অবহেলায় ফাইলবন্দি হয়ে আছে।

নারায়ণগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবি এডভোকেট মেজবাহউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশের কারণে কুকুর নিধন বন্ধ রয়েছে। এ আইন প্রত্যাহার করা দরকার। কারণ মানুষের জীবনের দাম বেশি।

চিকিৎসকদের পরামর্শ

রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের বলেন, আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন কুকুরে কামড়ানো রোগী আসে। কুকুর কামড়ানোর বা আঁচড়ানোর পর প্রথম ১৫ মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে ক্ষতস্থানটি ক্ষারযুক্ত সাবান এবং রানিং ওয়াটার (প্রবাহিত পানি) দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেললে ভাইরাসের তীব্রতা প্রায় ৮০ ভাগ কমে যায়। এরপর দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাসপাতালে গিয়ে ভ্যাকসিন নিতে হয়। কুকুর কামড়ালে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে এআরভি এবং গভীর ক্ষতের ক্ষেত্রে আরআইজি ইনজেকশন দেওয়া বাধ্যতামূলক।

করণীয় কি? 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে কুকুর না মেরে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার উদ্যোগে জরুরি ভিক্তিতে কুকুর বন্ধ্যাকরণ প্রকল্প চালু করতে হবে। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে এআরভি ভ্যাকসিনের স্থায়ী ও নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পশুর কামড়ের পর ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের মতো কুসংস্কার রোধে গ্রামীণ পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

প্রশাসন যদি এখনই বন্ধ্যাকরণ ও ভ্যাকসিনের পর্যাপ্ত যোগান নিশ্চিত না করে, তবে আগামী দিনে এই আতঙ্কের চার পা’ আরো বহু প্রাণ কেড়ে নেবে, যার দায় এড়াতে পারবে না কেউ?

নষ্ট দুধ, তবু শিক্ষকরা বললেন—‘খেয়ে নাও, কিছু হবে না’

প্রশাসন যা বলছে

রূপগঞ্জ উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সজল কুমার বলেন, গত কয়েক বছর ধরে কুকুরের ভ্যাকসিন নেই আমাদের কাছে। কোন সাপ্লাই নেই। আদালতের নির্দেশনার কারণে কুকুর নিধন করা যায় না। তবে জনসচেতনতা কার্যক্রম চলছে।

আড়াইহাজার উপজেলার প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আতাউর রহমান বলেন, আড়াইহাজারের তিন গ্রামের ৫০ জনেরও বেশি লোককে পাগলা কুকুর কামড়ে আক্রান্ত করেছে। বিষয়টি ভাববার মতো। অনেকেই আতঙ্কে আছে। আমাদের নজরদারি চলছে।

আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের হাসপাতাল থেকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, সঠিক চিকিৎসা দিতে পারবো। তবে সবাইকে সর্তক থাকতে হবে।

নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের (ভিক্টোরিয়া) আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. জহিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের হাসপাতালে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০ রোগী আসে। ভ্যাকসিন একসময় সংকট ছিল। এখন সংকট কেটে গেছে। 

নারায়ণগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন কর্তকর্তা ডা. মশিউর রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জে কুকুরের উপদ্রব অনেক বেশি। প্রতিদিনই শত শত রোগী আসে আক্রান্ত হয়ে। চাহিদা আছে, চাপও আছে। তবে আমাদের মজুদও রয়েছে। আশা রাখি, কোনো সমস্যা হবে না।

—জা. অর্থনীতি/এনজে