Print Date & Time : 07 November 2026 Saturday 11:19 pm

প্রথম বিমানবাহী রণতরি হাতে পেল ইন্দোনেশিয়া

image

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রথমবারের মতো একটি বিমানবাহী রণতরি হাতে পেয়েছে ইন্দোনেশিয়া। ইতালির কাছ থেকে পাওয়া তাদের ব্যবহার করা যুদ্ধজাহাজটি শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে উত্তর জাকার্তার তানজুং প্রিয়ক বন্দরের নৌঘাঁটিতে পৌঁছেছে। সামরিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাহাজটিকে স্বাগত জানানো হয়। তবে পুরোনো এই রণতরি নিয়ে দেশটিতে এর প্রয়োজনীয়তা, সংস্কার ব্যয় ও ইন্দোনেশিয়ার সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪১ বছর বয়সী সাবেক ইতালীয় যুদ্ধজাহাজ আইটিএস জিউসেপ্পে গারিবাল্ডিতে স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন ও উল্লম্ব অবতরণে সক্ষম বিমান এবং হেলিকপ্টার পরিচালনার সুবিধা রয়েছে। আগামী সপ্তাহে জাহাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীতে যুক্ত হবে। তখন এর নাম হবে কেআরআই গাজাহ মাদা। চতুর্দশ শতকের মাজাপাহিত সাম্রাজ্যের সামরিক নেতা গাজাহ মাদার নামেই জাহাজটির নামকরণ করা হয়েছে।

ইতালি গত মার্চে ২০২৪ সালে অবসরে যাওয়া জাহাজটি ইন্দোনেশিয়াকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটির সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোই এর অন্যতম লক্ষ্য। একই সঙ্গে সাবমেরিন ও সামরিক বিমান বিক্রির মতো প্রতিরক্ষা চুক্তির সুযোগও খুঁজছে ইতালি। রণতরিটি ইন্দোনেশিয়াকে দিয়ে দেওয়ায় জাহাজটি ধ্বংস বা অবসরে নেওয়ার খরচও ইতালির সাশ্রয় হচ্ছে।

গাজাহ মাদা যুক্ত হওয়ার পর ইন্দোনেশিয়া হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় দেশ, যার নৌবহরে বিমানবাহী রণতরি রয়েছে। এর আগে ১৯৯৭ সালে স্পেন থেকে কেনা এইচটিএমএস চাকরি নারুয়েবেত কমিশন করার মাধ্যমে থাইল্যান্ড এ অঞ্চলে প্রথম দেশ হিসেবে এমন সক্ষমতা অর্জন করে। তবে থাইল্যান্ডের রণতরিটি বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজ হিসেবে পরিচালনার জন্য এভি-৮এস ম্যাটাডর জাম্প-জেটও সংগ্রহ করেছিল।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সরকার প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোকে অন্যতম অগ্রাধিকার দিয়েছে। সাবমেরিন, ফ্রিগেট, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র কেনার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবেই গারিবাল্ডি অধিগ্রহণকে দেখা হচ্ছে।

তবে রণতরিটি হাতে পাওয়ার পর থেকেই এর খরচ ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক, অর্থনীতিবিদ ও বিরোধী রাজনীতিকরা। তাদের প্রশ্ন, হাজার হাজার দ্বীপ নিয়ে গঠিত ইন্দোনেশিয়ার আদৌ বিমানবাহী রণতরি প্রয়োজন কি না। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে কয়েক দশক পুরোনো একটি যুদ্ধজাহাজ সংস্কার ও পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয় করা কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়েও বিতর্ক চলছে।

২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয় রণতরি কর্মসূচির জন্য ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদন করে। তবে কয়েকজন আইনপ্রণেতার আশঙ্কা, প্রকল্পটির মোট ব্যয় এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। পার্লামেন্টের কমিশন-১-এর সদস্য টিবি হাসানউদ্দিন বলেছেন, শুধু রণতরিটির সংস্কারেই ১৬ ট্রিলিয়ন রুপিয়া বা প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে।

বড় নৌ সামরিক শক্তিগুলো যেখানে নিজ দেশের উপকূল থেকে অনেক দূরে যুদ্ধবিমান পরিচালনায় বিমানবাহী রণতরি ব্যবহার করে, ইন্দোনেশিয়ার পরিকল্পনা কিছুটা ভিন্ন। দেশটি জাহাজটিকে মূলত মোবাইল কমান্ড সেন্টার এবং হেলিকপ্টার, ড্রোন ও সামুদ্রিক অভিযানের সহায়ক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের কথা ভাবছে। দেশটির বিস্তীর্ণ দ্বীপাঞ্চলে দ্রুত সামরিক ও বেসামরিক সহায়তা পৌঁছাতেও এটি ব্যবহার করা হবে।

চলতি মাসের শুরুতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক বৈঠকে প্রাবোও বলেন, রণতরিটি বন ও পিটভূমিতে আগুন মোকাবিলায় কাজে লাগানো যাবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিয়মিত এ ধরনের আগুন থেকে ঘন ধোঁয়া ও দূষণ ছড়িয়ে পড়ে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজটিতে ব্ল্যাক হক ও এমআই-১৭-এর মতো সক্ষমতার মাঝারি আকারের সর্বোচ্চ ১০টি হেলিকপ্টার রাখা সম্ভব হবে। এসব হেলিকপ্টার বিপুল পরিমাণ পানি বহন করে আগুনপ্রবণ এলাকায় কাজ করতে পারবে।

এছাড়া জাহাজ থেকে ড্রোন পরিচালনা এবং ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দ্রুত মোতায়েনের পরিকল্পনাও রয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত ইন্দোনেশিয়ায় প্রায়ই বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে।

তবে একটি বিমানবাহী রণতরি পরিচালনা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় এই জাহাজটি ইন্দোনেশিয়ার জন্য কতটা প্রয়োজনীয় এবং এর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন ব্যয় দেশটির অর্থনীতির ওপর কতটা চাপ তৈরি করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

এই বিতর্কের মধ্যে দেশটির অর্থনীতিতেও বাড়ছে চাপ। প্রাবোও সরকারের বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার কর্মসূচিসহ বিভিন্ন ব্যয়বহুল উদ্যোগের অর্থায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে অর্থনীতিবিদরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। কর্মসূচিটিতে একাধিক খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারি রাজস্ব কমে যাওয়া এবং বাজেটের সীমাবদ্ধতার কারণে বড় সরকারি ব্যয়ের প্রকল্পগুলো এখন আরও বেশি সমালোচনার মুখে পড়ছে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

—জা.অর্থনীতি/জেআরটি